সারা দেশে জ্বালানি তেলের সংকটকে পুঁজি করে বগুড়ার শেরপুরে ফিলিং স্টেশনগুলোতে চলছে চরম বিশৃঙ্খলা ও কালোবাজারি। জেলা প্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা, হেলমেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র যাচাই করে তেল সরবরাহের কথা থাকলেও তার কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। মহাসড়ক দখল করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ বাইকাররা। অন্যদিকে কিছু যুবক বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সংগ্রহ করে বোতলে করে চড়া দামে বিক্রি করছে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। যেখানে পাম্পগুলো আগে একবার তেল আনলে ৭ দিন ধরে বিক্রি করতে পারত, সেখানে এখন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই তেলশূন্য হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, এত তেল যাচ্ছে কোথায়?
সরেজমিনে দেখা যায়, তেল নিতে আসা গ্রাহকদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা। এলোমেলোভাবে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে প্রতিনিয়তই ঘটছে বাকবিতণ্ডা, পরিস্থিতি গড়াচ্ছে হাতাহাতি পর্যন্ত। পাম্পগুলোর সামনে মহাসড়কের একাংশ দখল করে বাইকের দীর্ঘ লাইন তৈরি হওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। এতে সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন চালকদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
বিশৃঙ্খলারোধে এবং সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিতে বগুড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে শেরপুর উপজেলার ৯টি ফিলিং স্টেশনে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেলমেট ও গাড়ির বৈধ কাগজপত্র যাচাই করেই কেবল তেল সরবরাহ করা হবে। আশেপাশের অন্যান্য উপজেলায় এই নির্দেশনার সুফল দেখা গেলেও শেরপুরে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধিকাংশ পাম্পে ট্যাগ অফিসারদের ভূমিকা একেবারেই চোখে পড়ার মতো নয়। অনিয়মকেই এখানে নিয়মে পরিণত করা হয়েছে।
গতকাল ‘নাবিল হাইওয়ে ফিলিং স্টেশনে’ অভিযান চালিয়ে কাগজপত্র ও হেলমেট না থাকায় দুই বাইকারকে জরিমানা করে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রশাসনের অভিযান শেষ হওয়ার পরপরই সেখানে আবারও শুরু হয় সেই পুরোনো নৈরাজ্য। বিনা হেলমেট ও কাগজপত্রে অবাধে দেওয়া হতে থাকে তেল। এ বিষয়ে ফিলিং স্টেশনের মালিকরা বলেন, ট্যাগ অফিসাররা তাদের যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন, তারা সেভাবেই তেল দিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। কারো মোটরসাইকেলের ট্যাংকিতে ৫০০ টাকার তেল দিতে নিয়ে মাত্র ২০০ টাকার তেল তুলতেই ভরে যাচ্ছে। এ ছাড়াও একদল কিশোর সিন্ডিকেট মোটরসাইকেল নিয়ে শেরপুরের পাম্পগুলো থেকে তেল সংগ্রহ করছে। এরপর তারা বগুড়ার দিকে গিয়ে বিভিন্ন পাম্প ঘুরে একাধিকবার ট্যাঙ্ক পূর্ণ করে ফিরে আসছে। পরে সেই তেল বোতলজাত করে খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রি করছে তারা। এতে জ্বালানি সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
তেলের এই হাহাকারে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চাকুরীজীবী ও বিভিন্ন কোম্পানির মাঠপর্যায়ের কর্মীরা। প্রয়োজন অনুযায়ী মোটরসাইকেলে তেল না পাওয়ায় তারা সঠিকভাবে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পেরে চাকরি হারানোর অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, পাম্পগুলোতে কঠোরভাবে কাগজপত্র যাচাই ও নিয়ম মেনে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কালোবাজারি রোধে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা জরুরি। এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী তেল সরবরাহের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অমান্য করায় গতকাল নাবিল হাইওয়ে ফিলিং স্টেশনে দুজনকে জরিমানাও করা হয়েছে। নির্দেশনার বাইরে গিয়ে কেউ তেল দিচ্ছে কি না বা কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না—তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর