• ঢাকা
  • ঢাকা, শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ১২ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:৫০ বিকাল

চকরিয়া-পেকুয়ায় ১৩ সিএনজি স্টেশন বসিয়ে বেপরোয়া চাঁদাবাজি

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

কক্সবাজারের পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলায় সিএনজি স্টেশনকে কেন্দ্র করে সংগঠিত চাঁদাবাজির এক বিস্তৃত নেটওয়ার্কের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের নাম ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা আদায় করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি অদৃশ্য এক ছায়া নিয়ন্ত্রণে চলছে। প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো হস্তক্ষেপ না থাকায় এই কার্যক্রম আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

চালকদের দাবি, এই চাঁদাবাজির কেন্দ্রে রয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল পেকুয়া উপজেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. হারুন অর রশিদ। তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট পেকুয়া-চকরিয়ার অন্তত ১২ থেকে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিএনজি স্টেশন বসিয়ে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে পেকুয়া-চকরিয়ার বিভিন্ন সড়কে ধীরে ধীরে এই চাঁদা আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। শুরুতে এটি সীমিত আকারে থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা বিস্তৃত হয়ে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কে রূপ নেয়। ‘সমিতি পরিচালনা’, ‘লাইন নিয়ন্ত্রণ’ কিংবা ‘শৃঙ্খলা রক্ষা’- এমন নানা অজুহাতে চালকদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু এসব কার্যক্রমের পেছনে কোনো সরকারি অনুমোদন বা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

বিষয়টি নিয়ে খোদ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কক্সবাজার জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম।

চালকদের দেয়া তথ্য ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, পেকুয়া ও চকরিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে স্থায়ীভাবে স্টেশন বসিয়ে চাঁদাবাজির একটি কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, মগনামা-বরইতলী, চকরিয়া সড়কের মগনামা লঞ্চঘাট, মগনামা কাজী মার্কেট, পেকুয়া বাজারের একাধিক স্থান, রাজাখালী ইউনিয়নের আরবশাহ বাজার, পেকুয়া চৌমুহুনী, চকরিয়ার বরইতলী নতুন রাস্তার মাথা ও চকরিয়া শহরের বিভিন্ন পয়েন্টের এসব স্থানে মোট ১৩টি স্টেশন বসানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রতিটি স্টেশনে একজন করে ‘লাইনম্যান’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সড়কে থাকা সিএনজি থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই লাইনম্যানরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করলেও পুরো অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টনের বিষয়টি একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়।

একজন সিএনজি চালক বলেন, ‘প্রথমে বলা হয়েছিল, এটা নিয়ম করার জন্য। পরে দেখি, শুধু টাকা তোলার জন্যই সব। টাকা না দিলে স্ট্যান্ডে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে যায়।’

স্থানীয় চালকসহ সংশ্লিষ্টদের দাবি, চকরিয়া ও পেকুয়ার বিভিন্ন সড়কে প্রতিদিন হাজারের বেশি সিএনজি ও অটোরিকশা চলাচল করে। এসব যানবাহন থেকে প্রতিদিন মাত্র ২০ টাকা করে আদায় করা হলেও দিনের শেষে সেই অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার টাকায়, যা মাসে গিয়ে ছাড়িয়ে যায় ৬ লাখ টাকা। এর বাইরে ‘পুলিশের নামে’ মাস শেষে প্রতিটি গাড়ি থেকে আরও ২০০ টাকা করে আদায় করা হয়। চালকদের ভাষ্য, এই টাকা না দিলে পথে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। তাদের অভিযোগ, এই বিপুল অর্থ কোথায় যাচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই, আর এর পুরো প্রক্রিয়াটিই চলছে অঘোষিত চাপ ও ভয়ের মধ্যে।

শাহজালাল নামে এক যাত্রী জানান, চাঁদাবাজির কারণে সম্প্রতি সিএনজির ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে ৪০ টাকা ভাড়া লাগত। বর্তমানে এ রুটে ৬০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। এভাবে চাঁদার প্রভাব পড়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।

সিএনজি মালিকদের অভিযোগ, অটোরিকশা, টেম্পু ও সিএনজি সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়ন সমিতির সভাপতি পরিচয়ে প্রভাবশালী নেতা হারুন ও ট্রাফিক পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে গুরত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে ভ্রাম্যমাণ সিএনজি স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করছে। হারুনের সাথে মাসিক চুক্তি করলেই তাদের দস্তখত সম্বলিত কিছু কার্ড ও স্টিকার দেন। আর ওই কার্ড দেখালে ও স্টিকার সিএনজির সামনের গ্লাসে লাগালেই রেজিস্ট্রেশনবিহীন সিএনজিগুলো ট্রাফিক পুলিশ অথবা অন্য যে কারো ঝামেলা ছাড়াই যেখানে-সেখানে গাড়ি চালানো যায়। তবে চুক্তিবিহীন সিএনজির রেজিস্ট্রেশন অথবা ফিটনেস ঠিক থাকলেও পদে পদে সমস্যায় পড়তে হয়। তবে যতই সমস্যায় পড়ুক হারুন ও তার নিয়োগকৃত লোকজনকে ফোন দিলেই নিমিষেই সব কিছুর সমাধান হয়ে যায় বলে দাবি চালকদের।

একজন অটোরিকশা চালক বলেন, ‘মাসে ২০০ টাকা দিতে হয়। বলা হয়, পুলিশকে দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটা কোথায় যায়, কেউ জানে না।’

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত কাগজ ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে একটি সিএনজি সড়ক পরিবহন সমিতির নাম উল্লেখ করে মো. হারুনুর রশিদকে সভাপতি হিসেবে দেখানো হয়। এই দলিল প্রকাশের পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, এই ধরনের দলিল দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি বৈধতার আড়ালে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও দলিলটির সত্যতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

চালকদের বড় অংশই নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক। তাদের ভাষ্য, নির্ধারিত চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়। স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে বাধা দেওয়া, যাত্রী তুলতে না দেওয়া কিংবা মৌখিক হুমকি- এসব ঘটনা নিত্যদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একজন চালক বলেন, ‘আমরা প্রতিবাদ করতে চাই, কিন্তু পারি না। আয় বন্ধ হয়ে গেলে পরিবার চলবে কীভাবে?’

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, ‘এটা সবার জানা। কিন্তু কেউ কিছু বলে না। কারণ, যারা করছে তাদের প্রভাব আছে।’

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় আট মাস ধরে এই চাঁদাবাজি চললেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

সচেতন মহলের মতে, সড়কভিত্তিক এমন সংগঠিত চাঁদাবাজি শুধু চালকদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং পুরো এলাকার অর্থনৈতিক প্রবাহেও প্রভাব ফেলছে।

নজিবুল ইসলাম নামের এক শিক্ষক বলেন, ‘আইনের শাসন যদি বাস্তবে না থাকে, তাহলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। প্রশাসনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া।’

পেকুয়া-চকরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে গড়ে ওঠা এই চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক এখন এক ধরনের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রতিদিনের ছোট ছোট অঙ্ক মিলিয়ে বড় অঙ্কের অর্থের লেনদেন, অস্বচ্ছতা এবং ভয়ের সংস্কৃতি- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার নিচ্ছে। দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই প্রবণতা আরও বিস্তার লাভ করতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

জানতে চাইলে অভিযুক্ত পেকুয়া উপজেলা শ্রমিকদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. হারুন অর রশিদ দৈনিক গাড়িপ্রতি টাকা আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, প্রতিটি গাড়ি থেকে ১০ থেকে ২০ টাকা করে নেওয়া হয়। ১৩টি পয়েন্ট থেকে যে টাকা তোলা হয়, তা চালক-শ্রমিকদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। লাইনম্যানদের বেতন দিতে হয়, পাশাপাশি থানা-পুলিশের খরচও আছে। তবে আপনারা যে পরিমাণ টাকার কথা বলছেন, বাস্তবে এত টাকা ওঠে না। তারপরও প্রশাসন যদি টাকা নিতে নিষেধ করে, আমরা আর নেব না।

এ বিষয়ে পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি বাহাদুর শাহ বলেন, ‘সিএনজি সমিতি নামে একটি সংগঠন আছে, এটা জানি। কিন্তু তাদের মাধ্যমে টাকা তোলার বিষয়টি আমার জানা নেই।’

অন্যদিকে কক্সবাজার জেলা শ্রমিকদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে হারুনের কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। আমাদের দল কাউকে চাঁদাবাজির অনুমতি দেয়নি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে লিখুন, যাতে ঊর্ধ্বতন মহলসহ সালাউদ্দিন ভাইয়ের নজরে আসে।’

জানতে চাইলে পেকুয়া থানার ওসি তদন্ত ইমরুল হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা নেই। খোঁজ-খবর নিতে হবে।’

কুশল/সাএ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:

BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ info@bd24live.com
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ office.bd24live@gmail.com