মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে ইরান প্রসঙ্গে কিছু ভালো খবর থাকার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে হরমুজ প্রণালি খুললেও চুক্তি না হলে আবারও যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। খবর রয়টার্সের।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, চারটি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসবাহী জাহাজসহ কয়েকটি তেল ও রাসায়নিক ট্যাংকারের একটি বহর লারাক দ্বীপের দক্ষিণে ইরানি জলসীমা অতিক্রম করে প্রণালি পাড়ি দিচ্ছিল। এসময় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আরও কয়েকটি জাহাজ তাদের অনুসরণ করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সাত সপ্তাহ আগে হামলা শুরু করার পর এটিই প্রথম বড় আকারের জাহাজ চলাচল।
চলমান অবস্থা সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ইরান ইস্যুতে কিছু বেশ ভালো খবর রয়েছে, যদিও তিনি বিস্তারিত জানাননি। তিনি সতর্ক করে বলেন, বুধবারের মধ্যে কোনো শান্তিচুক্তি না হলে যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বৃহস্পতিবার হওয়া পৃথক যুদ্ধবিরতির পর ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
প্রণালি খুলে দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা পুনরায় শুরু হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতপার্থক্য বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
ফিনিক্স থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে পরিস্থিতি বেশ ভালো যাচ্ছে। আমরা সপ্তাহান্তে আলোচনায় বসছি। অনেক বিষয়ে আগেই আলোচনা ও দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। এটা অন্য সবকিছুর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি না হলে যুদ্ধবিরতি বাতিল হতে পারে। এছাড়া ইরানের বন্দর অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলেও জানান।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকানদের ওপরও চাপ রয়েছে।
ট্রাম্প রয়টার্সকে জানান, সপ্তাহান্তে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা হতে পারে। তবে কূটনীতিকরা বলছেন, ইসলামাবাদে আলোচনার আয়োজনের বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
আজ শনিবার সকাল পর্যন্ত পাকিস্তানের রাজধানীতে কোনো প্রস্তুতির লক্ষণ দেখা যায়নি। গত সপ্তাহে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা ফল ছাড়াই শেষ হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির তেহরানে তিন দিনের আলোচনা শেষ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ক সফর শেষে ইসলামাবাদে ফিরছেন।
একটি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক হতে পারে, যার পর ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি সম্ভব।
যদিও ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের ক্বালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে না।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতির ১০ দিনের সময়কালে সব বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে পারবে। তবে এখন জাহাজগুলোকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামরিক বা শত্রুপক্ষের জাহাজ প্রবেশ করতে পারবে না।
প্রসঙ্গত, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধ এখনো বড় বাধা। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে, কিন্তু ইরান তা প্রত্যাখ্যান করেছে। একজন ইরানি কর্মকর্তা জানান, কয়েক দিনের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তি হতে পারে। তবে এখনো অনেক ফাঁক রয়ে গেছে।
গত সপ্তাহের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের জন্য পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধের প্রস্তাব দেয়, যেখানে ইরান ৩ থেকে ৫ বছরের স্থগিতাদেশ চায়। কিছু আপসের সম্ভাবনা দেখা গেলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা ধীরে-সুস্থে এগোবো। বড় যন্ত্র দিয়ে খনন করে ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসব।
তবে ইরানি সূত্রগুলো বলছে, এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। শুক্রবারের জুমার খুতবায় কট্টর অবস্থান তুলে ধরে ধর্মীয় নেতা আহমদ খাতামি বলেন, আমাদের জনগণ অপমানিত হয়ে আলোচনা করবে না।
সামগ্রিকভাবে, পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তির দিকে গেলেও যুদ্ধ, আলোচনা এবং পারমাণবিক ইস্যু; সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর