পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাজধানীর শাহবাগ থানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) কর্মরত সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হামলার ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মানববন্ধন করেছে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে যুক্ত থাকা ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা। এসময় মানববন্ধনগুলো থেকে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিতের দাবিতে হামলায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
শনিবার পৃথক-পৃথক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি ক্যাম্পাসে হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করে ক্যাম্পাসগুলোতে দায়িত্বরত সাংবাদিকরা। এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির আয়োজনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে সাংবাদিক সমিতির বর্তমান সদস্যদের পাশাপাশি সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে দায়িত্বরত সাংবাদিকরা অংশ নেয়।
এসময় বক্তারা সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত, মামলা গ্রহণ, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্যাম্পাসে স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘যারা সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের ওপর নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে, নির্যাতন করেছে, তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এটি যদি করা না হয়, তাহলে আমি মনে করব, সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ বিগত ১৭ বছরে যেভাবে অধিকারবঞ্চিত হয়েছে, সাংবাদিক সমাজ যেভাবে নির্যাতিত-নিষ্পেষিত হয়েছে, আবার সে পথে যদি এই সরকার হাঁটতে চায়, তাহলে আমরা যে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমরা যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে এবং এই সরকার আবার নতুন রূপে ফ্যাসিবাদে আবির্ভূত হবে। এর পরিণতি খুব খারাপ।’
হামলার ঘটনাটি মামলায় লিপিবদ্ধের দাবি জানিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সম্পাদক ও ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি মাহবুব রনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনায় মামলাটি এখন পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হয়নি। আপনাদের কম্পাউন্ডেই এই বিশৃঙ্খলা এবং হামলা হয়েছে। সুতরাং পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি আমাদের দাবি এবং আহ্বান থাকবে অনতিবিলম্বে সেই মামলা গ্রহণ করুন। মামলা করে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষার্থীদের ওপর বা যে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে, তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী। আবার এখানে প্রাথমিকভাবে হামলাকারী হিসেবে চিহ্নিত যাদের নাম এসেছে, তারাও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই হামলাকারী শিক্ষার্থীদেরও অনতিবিলম্বে চিহ্নিত করে বিচার করতে হবে, শাস্তি দিতে হবে।’
হামলা ঘটনাটির দায় ছাত্রদল এড়াতে পারে না উল্লেখ করে মাহবুব রনি বলেন, ‘হামলায় জড়িত যারা শাহবাগ থানায় গিয়েছিলেন, তারা ছাত্রদলের ব্যানারে গিয়েছিলেন। সংগঠন হিসেবে ছাত্রদলও এই হামলার দায় এড়াতে পারে না। তারা একটি তদন্ত কমিটি করেছে, এ জন্য সাধুবাদ পেতে পারে। কিন্তু অনতিবিলম্বে দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এই দাবি আমাদের থাকল।’
ইংরেজি দৈনিক দ্য ডে ইলি স্টা রের সাংবাদিক ও ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম রুবেল বলেন, ‘আপনারা দেখবেন, তাদের ওপর যে হামলা হয়েছে, সেটির প্লেস অব অকারেন্স কোথায়? সেটি হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটে শাহবাগ থানার মধ্যেই। অপরাধ সংঘটনের স্থান হচ্ছে শাহবাগ থানার মধ্যেই অথচ এই হামলার বিচারের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি শাহবাগ থানায় গিয়ে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করেও থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ভারপ্রাপ্ত অফিসার, ওসি সাহেব তাকে চার ঘণ্টায় শাহবাগ থানায় পাওয়া যায়নি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা অপরাধীর পক্ষ নেবেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে আমরা দেখেছি, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের ওপর নানা সময়ে হামলা হয়েছে। সেটির বিচার আমরা পেয়েছি। সে সময় আমরা যদি বিচার পেয়ে থাকি, তাহলে এখন ৫ আগস্টের পরে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি থাকার কথা। এত দেরি হচ্ছে কেন?’
সাংবাদিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘গত আট বছর ধরে সাংবাদিকতা করছি। এ ধরনের ঘটনা গত আট বছরে কখনো দেখিনি। শিক্ষার্থীরা যখন আন্দোলনে আসতেন, তখন তাদের নানাভাবে সহযোগিতা করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি। অথচ আজ তাদের ওপরই হামলা করল ছাত্রদল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আশা করি, এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রদল সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু ব্যবস্থা না নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিক সমিতিসহ সাংবাদিকদের নিয়ে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি কখনো কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না।’
জড়িতদের শাস্তির নিশ্চিত না করা হলে দেশব্যাপী বৃহৎ কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারী দিয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহাদী হাসান বলেন, ‘যদি আমাদের দাবি দ্রুত সময় আদায় না হয় সারা দেশে যতগুলা ক্যাম্পাস আছে, যতগুলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে তাদের নিয়ে আমরা কঠিন কর্মসূচিতে বাধ্য হব।’
ভুক্তভোগী সাংবাদিক সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি মানজুর হোসাইন মাহি বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যে দাবিগুলো জানিয়েছি, আমি আশা করি তারা অতি দ্রুত সেগুলো মেনে নেবে এবং হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।'
নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলাম বলেন, ‘শাহবাগ থানার ভেতরে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা শুধু নিন্দনীয় নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। এ ঘটনায় বিচার নিশ্চিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা আরও দ্রুত ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।'
এসময় অন্যান্যদের মধ্যে ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য ইয়ামিন সাজিদ, চায়না গ্লোবাল টেলিভিশন নেটওয়ার্কের (সিজিটিএন) বাংলাদেশ প্রতিনিধি হোসাইন তারেক, সাংবাদিক ও ফ্যাক্টচেকার কদরুদ্দিন শিশির, দৈনিক এদিন-এর সাংবাদিক সুমন্ত চক্রবর্তী, আল জাজিরার সাংবাদিক মওদুদ আহমেদ সুজন, দৈনিক গণজাগরণের সাংবাদিক মো. আবু সাঈদ, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির দপ্তর সম্পাদক রাইসুল ইসলামসহ আরো অনেকে মানববন্ধনে উপস্থিত হয়ে সংহতি জানান।
এর আগে বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাত আটটার দিকে শাহবাগ থানার ভেতরে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে সমিতির সভাপতি ও কা লের ক ণ্ঠের সাংবাদিক মানজুর হোসেন মাহি এবং সাধারণ সম্পাদক ও আগামীর সময়ের সাংবাদিক লিটন ইসলামসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, এর আগের দিনও বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলে তাদের হেনস্তা ও হুমকি দেওয়া হয়।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর