টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে বান্দরবানের লামা উপজেলায় বন্যা কবলিত হয়েছে। তার সাথে উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশন পাড়ায় পাহাড়ধসে দুই পরিবারে শিশুসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোররাত সাড়ে ৪টায় এই ঘটনা ঘটে।
আজিজনগর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোবারক হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ভারী বৃষ্টিতে ইউনিয়ন বেশ কয়েকস্থানে পাহাড়ধস হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টায় পাহাড়ধসে মিশন পাড়ার বাসিন্দা মৃত আদম আলীর ছেলে মোঃ ইউনুস এবং আলী হায়দার এর ছেলে মোঃ জুয়েল এর বসতঘর ঘরে মাটির নিচে চাপা পড়ে। এসময় মোঃ ইউনুস সহ তার স্ত্রী রানু আক্তার তাদের সন্তান মোঃ সোলেমান এবং মোঃ জুয়েল তার স্ত্রী কুলসুমা আক্তার মাটি চাপা পড়ে মারা গেছে।
লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মঈন উদ্দিন বলেন, লামা ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় লোকজন মাটি সরিয়ে প্রায় ৪ ঘন্টা অভিযান চালিয়ে লাশ উদ্ধার করে। নিহতদের পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হবে।
এদিকে পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে বান্দরবানের লামা উপজেলা ১টি পৌরসভা ও ৭টি ইউনিয়নে জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম দুর্ভোগের চিত্র। পাহাড়ধস, সড়ক তলিয়ে যাওয়া, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, বসতবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, লামা পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় কয়েকটি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া লামা আলীকদম সড়কে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে, ফলে যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পাহাড়ি ঢলে পৌরসভার বেশকিছু এলাকা পানিতে ডুবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে। দুস্থ অসহায় মানুষের মাঝে হাহাকার বাড়ছে।
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের আড়াই মাইল থেকে বড়ছনখোলা ও কমিউনিটি সেন্টার বাজারে যাওয়ার একমাত্র কাঠের সেতুটি পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভেঙে গেছে। এতে কয়েকটি গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন চলাচল কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতও কঠিন হয়ে উঠেছে।
আজিজনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে আজিজনগর চাম্বি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের চারতলা ভবনের পেছনে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ায় ভবনটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিষয়টি দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
ফাইতং ইউনিয়নের কুইজ্জাখোলা পাড়ায় যাতায়াতের একমাত্র সড়ক ভারী বর্ষণের পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে স্থানীয় মানুষের চলাচল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে চরম সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সরই ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভাইগ্যার দোকান এলাকায় একটি সেতুর সংযোগ সড়কের মাটি সরে যাওয়ায় যানবাহন ও সাধারণ মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
লামা সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। অনেক এলাকায় মানুষ সীমিতভাবে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। রূপসীপাড়া ইউনিয়নের দুর্গম এলাকায় ভারী বর্ষণের কারণে পানি বেড়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া কয়েকটি স্থানে পাহাড়ধসের খবরও পাওয়া গেছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
গজালিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। কিছু গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের চলাচলে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো ভূমিধসের আশঙ্কায় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। চলমান দুর্যোগ পরিস্থিতিতে লামা উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নিচ্ছেন।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর