সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এগোলেও বেতন, ইনক্রিমেন্ট ও ভাতা কাঠামো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব কমিটি। বেতন কমিশনের সুপারিশ, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রচলিত নিয়মে সব গ্রেডে সমান হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার পরিবর্তে নতুন পে-স্কেলে আয়, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাস্তব প্রয়োজনের ভিত্তিতে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা গড়ে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। তবে নতুন প্রস্তাবে ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। পঞ্চম গ্রেডে ৪ শতাংশ, তৃতীয় ও চতুর্থ গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে। প্রথম গ্রেডের ইনক্রিমেন্ট পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হবে।
এদিকে নবম পে-স্কেলের সুপারিশ দ্রুত মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের লক্ষ্যে অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সরকার পরিচালিত এক জরিপে বর্তমান ইনক্রিমেন্ট ব্যবস্থার প্রতি সীমিত সমর্থনের চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ সরকারি চাকরিজীবী, ৬১ হাজার ৫০০ সাধারণ নাগরিক এবং ৩ হাজার ৫১৩টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের মধ্যে মাত্র ৫ দশমিক ৬ শতাংশ বর্তমান পদ্ধতির পক্ষে মত দিয়েছেন।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫০ দশমিক ৪৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বৃদ্ধি করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এছাড়া ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ জীবনযাত্রার ব্যয়কে ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের ভিত্তি করার সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে ৭৯ দশমিক ৫ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন আরও বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।
গত ৬ জুলাই সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সচিব কমিটির বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কমিটির সদস্যদের মতে, সুপারিশ চূড়ান্ত করতে আরও অন্তত দুটি বৈঠকের প্রয়োজন হতে পারে। এরপর তা অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। সরকারের অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পে-স্কেল অনুমোদনের পর প্রশাসনিক আদেশ জারি, গেজেট প্রকাশ এবং বেতন ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার হালনাগাদসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া বর্ধিত বেতন ও ভাতার বকেয়া অক্টোবর মাসে একসঙ্গে পরিশোধ করা হতে পারে।
নতুন বেতনকাঠামো প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। সিটি করপোরেশন এলাকায় এই ব্যয় ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা এবং ছয় সদস্যের একটি পরিবারের গড় মাসিক ব্যয় ৬৬ হাজার ২৫৩ টাকা।
বেতন কমিশনের সুপারিশে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সচিব কমিটিতে প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ১:৭.৫ রাখার বিষয়েও আলোচনা চলছে। বর্তমানে এই অনুপাত ১:৯.৪।
বর্তমানে ২০তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মচারী বেতন-ভাতা মিলিয়ে ১৬ হাজার ৯৫০ টাকা পান। নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে সেই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৪১ হাজার ৯০৮ টাকায় পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি যাতায়াত, টিফিন, ধোলাই ও ঝুঁকিভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধিরও প্রস্তাব রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর