ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি ফুটবলার ও সাবেক জাতীয় দলের কোচ কেভিন কিগান আর নেই। ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে ৭৫ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তার পরিবার জানিয়েছিল, কিগানের শরীরে স্টেজ-৪ ক্যানসার ধরা পড়েছে এবং তিনি চিকিৎসা শুরু করতে যাচ্ছেন। স্কাইস্পোর্টস
পরিবার এক বিবৃতিতে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে জানায়, গভীর শোকের সঙ্গে তারা কিগানের মৃত্যুর সংবাদ জানাচ্ছে। মৃত্যুর সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী ও দুই মেয়ে। পরিবারের ভাষ্য, দুইবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী কিগান শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলারই নন, একজন স্নেহশীল স্বামী, বাবা ও দাদাও ছিলেন। তার চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পরিবার এ কঠিন সময়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অনুরোধ জানিয়েছে।
ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে কেভিন কিগানকে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৬৮ সালে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করে ১৯৮৫ সালে অবসর নেওয়ার আগে তিনি ক্লাব পর্যায়ে প্রায় ৭৫০টি ম্যাচ খেলেন। স্কানথর্প ইউনাইটেডে ক্যারিয়ার শুরু করলেও লিভারপুলের জার্সিতেই নিজেকে বিশ্বমানের তারকায় পরিণত করেন। ক্লাবটির হয়ে তিনবার ইংলিশ ফার্স্ট ডিভিশন শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ৩২৩ ম্যাচে ১০০ গোল করেন তিনি।
লিভারপুল ছাড়ার পর জার্মান ক্লাব হামবুর্গে যোগ দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারকে আরও সমৃদ্ধ করেন কিগান। হামবুর্গের হয়ে খেলার সময় ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে টানা দুইবার ব্যালন ডি'অর জিতে বিশ্বসেরার স্বীকৃতি অর্জন করেন। এরপর সাউদাম্পটন ও নিউক্যাসল ইউনাইটেডেও সফল সময় কাটান। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের জার্সিতে ৬৩ ম্যাচে ২১ গোল করেন তিনি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষ হওয়ার সাত বছর পর ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোচ হিসেবে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেন কিগান। সে সময় ক্লাবটি দ্বিতীয় বিভাগে অবনমনের ঝুঁকিতে ছিল। তার নেতৃত্বে দলটি অবনমন এড়ানোর পাশাপাশি পরের মৌসুমেই প্রিমিয়ার লিগে উন্নীত হয়।
১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে কিগানের অধীনেই নিউক্যাসল দীর্ঘ সময় প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার ছিল। একপর্যায়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের চেয়ে ১২ পয়েন্ট এগিয়েও ছিল দলটি। তবে মৌসুমের শেষ দিকে ধারাবাহিকভাবে পয়েন্ট হারানোয় স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিতে নেয়। সেই মৌসুমে লিডস ইউনাইটেডকে হারানোর পর সংবাদ সম্মেলনে কিগানের আবেগঘন "I'd love it..." মন্তব্যটি ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।
১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইংল্যান্ড জাতীয় দলের প্রধান কোচ ছিলেন কিগান। তবে তার সময়টা খুব বেশি সফল ছিল না। ইউরো ২০০০-এ ইংল্যান্ড গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। পরে ২০০২ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে পুরোনো ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হারের পরপরই তিনি কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়ার পর ম্যানচেস্টার সিটির কোচ হন কিগান। ২০০২ সালে ক্লাবটিকে প্রথম বিভাগের চ্যাম্পিয়ন করে আবারও প্রিমিয়ার লিগে তুলে আনেন তিনি। ২০০৫ সালে ম্যানচেস্টার সিটি ছাড়ার পর প্রথমে ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেও ২০০৮ সালে আবেগঘনভাবে আবার নিউক্যাসল ইউনাইটেডে ফিরে আসেন। তবে ক্লাবের বোর্ড ও মালিক মাইক অ্যাশলির সঙ্গে মতবিরোধের কারণে দ্বিতীয় দফায় তার দায়িত্ব মাত্র আট মাস স্থায়ী হয়।
কিগানের মৃত্যুর পর শোক জানিয়েছে নিউক্যাসল ইউনাইটেড। ক্লাবটি এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রিয় ব্যক্তিত্বদের একজন ছিলেন কেভিন কিগান। তিনি শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার ও কোচ নন, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিউক্যাসল সমর্থকদের হৃদয়ের স্পন্দন ছিলেন। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি ক্লাবে নতুন বিশ্বাস ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছিলেন, আর কোচ হিসেবে শহরজুড়ে ফিরিয়ে এনেছিলেন আশা ও গর্ব। তার উত্তরাধিকার ম্যাচের ফলাফল দিয়ে নয়, বরং কোটি সমর্থকের হৃদয়ে গেঁথে থাকা স্মৃতি ও অনুপ্রেরণার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবে বলে উল্লেখ করেছে ক্লাবটি।
কিগানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে তার সাবেক ক্লাব সাউদাম্পটন ও ম্যানচেস্টার সিটিও। সাউদাম্পটন বলেছে, ব্যালন ডি'অরজয়ী হিসেবে ক্লাবে যোগ দিয়ে তিনি সমর্থকদের অসংখ্য আনন্দের মুহূর্ত উপহার দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ম্যানচেস্টার সিটি তাকে এমন একজন কোচ হিসেবে স্মরণ করেছে, যিনি ক্লাবে নতুন প্রাণ, আশাবাদ এবং সাফল্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন। ইংলিশ ফুটবল লিগও (ইএফএল) এক শোকবার্তায় বলেছে, খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকাতেই কেভিন কিগানের অবদান ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর