• ঢাকা
  • ঢাকা, শনিবার, ০৮ আগস্ট, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৩ মিনিট পূর্বে
নিউজ ডেস্ক
বিডি২৪লাইভ, ঢাকা
প্রকাশিত : ০৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৩০ বিকাল

শীতের দেশে বিজ্ঞানী, গরমে দেশে দারিদ্র্য? মানুষের ভাগ্য আসলে কে লেখে?

ছবি: প্রতিকী ছবি

দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিট। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ। পুরানা পল্টনের মোড়ে লালবাতিতে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি রিকশা। পিচঢালা রাস্তা থেকে গরম বাতাস এমনভাবে উঠছে, যেন মাটির নিচে অদৃশ্য কোনো চুল্লি জ্বলছে। বাতাসে আর্দ্রতা এত বেশি যে শরীরের ঘাম শুকানোর সুযোগই পাচ্ছে না। কপাল বেয়ে নেমে আসা ঘাম গামছা দিয়ে মুছে আবার প্যাডেলে পা রাখেন ৪২ বছর বয়সী আবুল কাসেম।

দুই ঘণ্টা আগে তিনি গ্যারেজ থেকে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু এখনই ক্লান্ত। চোখেমুখে অবসাদের ছাপ। তিনি বললেন, “আগে দুপুরেও রিকশা চালাতাম। এখন একটা বাজলেই শরীর আর চলে না। একটু বেশি চালালেই মাথা ঘুরে।”

এই মানুষটির কাছে গরম কেবল ঋতুর বৈশিষ্ট্য নয়; এটি প্রতিদিনের আয় কমে যাওয়ার আরেকটি নাম।

ঠিক এই সময় পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের কেমব্রিজ শহরে সকাল। বাইরে তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হার্ভার্ড ও এমআইটির গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা নতুন সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা ক্যানসারের ওষুধ নিয়ে কাজ করছেন। নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার কক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনোযোগ ধরে রাখা সেখানে কোনো বিলাসিতা নয়; এটি কাজের স্বাভাবিক পরিবেশ।

একজন লড়ছেন আজকের খাবারের জন্য। অন্যজন কাজ করছেন আগামী দশকের প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্মাণে।
এই দুই মানুষের পার্থক্য কি কেবল ব্যক্তিগত? নাকি এটি পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি?

রাশিয়ার প্রখ্যাত রসায়নবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী আর্তেম ওগানোভ, ছবি: সংগৃহীত

মানচিত্রের এক বিস্ময়কর মিল:

পৃথিবীর মানচিত্র খুললে একটি বিষয় চোখে পড়ে। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী অর্থনীতির বড় অংশ উত্তর আমেরিকা, উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপ, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে।

অন্যদিকে সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশ এখনও দারিদ্র্য, অপুষ্টি, জলবায়ু ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে লড়ছে।

এটি অবশ্য কোনো কঠোর নিয়ম নয়। ব্যতিক্রম আছে—সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার কিংবা মালয়েশিয়ার মতো দেশ সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তবু বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় ছবিতে জলবায়ু ও উন্নয়নের মধ্যে একটি সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই গবেষকদের কৌতূহলের বিষয়।

শীতল আবহাওয়া কি সত্যিই উন্নয়নের সহায়ক? নাকি উন্নয়ন এসেছে অন্য কারণে, আর জলবায়ু কেবল একটি সহায়ক উপাদান?

আফ্রিকান শ্রমিক, ছবি: সংগৃহীত
একসময় জলবায়ুকে পরিবেশবিদদের আলোচনার বিষয় মনে করা হতো। এখন আর তা নয়।
বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বলছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তীব্র গরমের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক, ডেলিভারি কর্মী, পোশাকশ্রমিক এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষ।
অর্থনীতির ভাষায় এটিকে বলা হয় Heat Stress Economy—অর্থাৎ এমন এক অর্থনীতি, যেখানে তাপমাত্রা নিজেই উৎপাদনশীলতার সীমা নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশে গরমের দিনে একজন কৃষক দুপুরে মাঠে কাজ বন্ধ করলে শুধু তার ব্যক্তিগত আয় কমে না; কমে দেশের কৃষি উৎপাদনও। নির্মাণশ্রমিক বিশ্রাম নিলে প্রকল্পের সময় বাড়ে। বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ে। সব মিলিয়ে অর্থনীতির ওপর পড়ে বহুমাত্রিক চাপ।

গরমের সঙ্গে মস্তিষ্কের সম্পর্ক:

আমরা সাধারণত মনে করি গরম কেবল শারীরিক কষ্ট বাড়ায়। কিন্তু আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত তাপ মানুষের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।

মানুষের শরীরের একটি বড় অংশের শক্তি ব্যয় হয় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে। বাইরে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেড়ে গেলে শরীর নিজের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে।

ফলে—মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার গতি ধীর হয়, স্মৃতিশক্তি সাময়িকভাবে দুর্বল হতে পারে, জটিল কাজের দক্ষতা কমে, ভুলের হার বাড়ে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিসুং পার্ক (Jisung Park) এবং তাঁর সহকর্মীদের একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, গরমের দিনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ফল তুলনামূলক খারাপ হয়। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত তাপমাত্রার মধ্যে পড়াশোনা করলে শেখার সামগ্রিক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এটি কেবল পরীক্ষার ফলের বিষয় নয়; ভবিষ্যতের মানবসম্পদেরও প্রশ্ন।

গরম মানেই কি কম কাজ? এটি সব ক্ষেত্রে নয়। শীতপ্রধান দেশের মানুষও তীব্র শীতে নানা সমস্যায় পড়েন। বরফঝড়, তুষারপাত, কম দিনের আলো—এসবও উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করে।

কিন্তু পার্থক্য হলো, অধিকাংশ উন্নত দেশ দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং কর্মপরিবেশকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যাতে আবহাওয়ার প্রভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

বাংলাদেশে একজন রিকশাচালক বা নির্মাণশ্রমিকের কাছে সেই সুযোগ নেই।

গরমের সঙ্গে লড়াই করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো প্রযুক্তি। কিন্তু প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার সবার সমান নয়।

রোগের অদৃশ্য অর্থনীতি: জলবায়ুর সঙ্গে রোগের সম্পর্ক বহু পুরোনো। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ মশা, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং বিভিন্ন পরজীবীর বিস্তারের জন্য অনুকূল। ফলে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া, টাইফয়েড এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে অনেক বেশি।
অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্স বহু বছর ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন, রোগের উচ্চমাত্রা কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি উন্নয়নেরও বড় বাধা।

একটি শিশু যদি বারবার অসুস্থ হয়, তার স্কুলে উপস্থিতি কমে। শেখার সক্ষমতা কমে। বড় হয়ে তার আয়ও তুলনামূলক কম হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

অন্যদিকে একটি পরিবার যখন চিকিৎসায় সঞ্চয় ব্যয় করে, তখন সেই অর্থ শিক্ষা বা ব্যবসায় বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় না। এভাবেই স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য একে অপরকে শক্তিশালী করে।

বাংলাদেশের নতুন সংকট:

একসময় গরম মানে ছিল বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের কয়েকটি মাস। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের সময়কাল দীর্ঘ হচ্ছে। রাতের তাপমাত্রাও আগের তুলনায় কম নামছে না। ফলে শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছে না।

চিকিৎসকদের ভাষায়, "হট নাইটস" বা অস্বাভাবিক উষ্ণ রাত এখন জনস্বাস্থ্যের নতুন চ্যালেঞ্জ। রাতে শরীর ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ না পেলে হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক চাপ এবং ঘুমের সমস্যা বাড়ে। অর্থাৎ গরমের প্রভাব দিনের কাজ শেষ হওয়ার পরও শেষ হয় না।

কিন্তু এই গল্পের অন্য দিকও আছে, তাহলে কি গরম দেশগুলোর মানুষের উন্নতির কোনো সুযোগ নেই?

একেবারেই নয়। যদি জলবায়ুই সবকিছু নির্ধারণ করত, তাহলে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভিয়েতনাম কিংবা মালয়েশিয়ার মতো দেশ কখনো উন্নত হতে পারত না।

তাহলে তারা কীভাবে পারল? কেন একই গরম আবহাওয়ায় কেউ বিশ্বনেতা হয়ে ওঠে, আবার কেউ দারিদ্র্যের চক্রে আটকে থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরতে হবে ইতিহাসের কাছে—উপনিবেশবাদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, শিল্পবিপ্লব এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির দীর্ঘ যাত্রাপথে।

যদি জলবায়ুই সবকিছু নির্ধারণ করত, তাহলে সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হলো?আবার যদি ইতিহাসই সব হতো, তাহলে একই ঔপনিবেশিক অতীত থাকা দেশগুলোর উন্নয়নের গতিপথ কেন এক নয়?

উত্তরটি একক নয়। উন্নয়ন কখনোই একটি মাত্র কারণে ঘটে না। এটি বহু উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া—যেখানে ভূগোল, জলবায়ু, ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব একে অন্যকে প্রভাবিত করে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বাস্তবতাকে বুঝে আগামী ২৫ থেকে ৩০ বছরের পরিকল্পনা করা।

বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা সংকটের মুখোমুখি।
প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, অনিয়মিত বর্ষা, নদীভাঙন এবং লবণাক্ততা বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, দ্রুত নগরায়ণের কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর মতো শহরগুলোতে 'আরবান হিট আইল্যান্ড' প্রভাব তীব্র হচ্ছে।
তৃতীয়ত, বিশ্বের শ্রমবাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স এবং অটোমেশন কম দক্ষতার অনেক কাজের ধরন পাল্টে দিচ্ছে। অর্থাৎ, আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে শুধু কম খরচে শ্রম সরবরাহের নয়; বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের।

ছবি: প্রতীকী ছবি

এবার প্রশ্ন হলো বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ কেন জরুরি?

বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোর দিকে তাকালে একটি মিল দেখা যায়—তারা গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে বড় বিনিয়োগ করে। ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সুইডেন কিংবা জার্মানির মতো দেশগুলো প্রতিবছর তাদের জিডিপির উল্লেখযোগ্য অংশ গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D)-এ ব্যয় করে।
গবেষণায় বিনিয়োগের ফল এক দিনে আসে না। আজ যে প্রযুক্তি বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে—সেমিকন্ডাক্টর, ইন্টারনেট, জিপিএস, এমআরএনএ ভ্যাকসিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—এসবের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের গবেষণা। বাংলাদেশকেও শুধু প্রযুক্তি আমদানিকারক নয়, প্রযুক্তি উদ্ভাবনকারী দেশ হওয়ার লক্ষ্য নিতে হবে।

শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন রূপ: বাংলাদেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শিক্ষার মান। আগামী দিনের শিক্ষায় গুরুত্ব পেতে হবে যে সব বিষয়ের উপর তাহলো- বিজ্ঞানমনস্কতা, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি, সমালোচনামূলক চিন্তা, গবেষণা দক্ষতা, ইংরেজি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা। একটি দেশ তখনই এগোবে, যখন তার বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি দেয় না; নতুন জ্ঞানও সৃষ্টি করে।

গরমের সঙ্গে লড়াই করেও উৎপাদনশীল থাকা সম্ভব। বাংলাদেশের জলবায়ু বদলানো সম্ভব নয়। কিন্তু কাজের পরিবেশ বদলানো সম্ভব।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো— নির্মাণ ও কৃষিখাতে গরমের সময়সূচি অনুযায়ী কর্মঘণ্টা পুনর্বিন্যাস। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা, কারখানায় উন্নত বায়ু চলাচল, তাপঝুঁকি সতর্কতা ব্যবস্থা, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতি, এসব পদক্ষেপ উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
অনেক দেশ ইতোমধ্যে চরম গরমের দিনে দুপুরের কাজ সীমিত করার নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশেও এমন নীতিগত উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।

সবুজ শহর মানেই শুধু সৌন্দর্য নয়। ঢাকার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো কংক্রিটের আধিক্য। গাছ কমছে। খেলার মাঠ কমছে।
জলাশয় হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে শহর আরও বেশি তাপ ধরে রাখছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে—নতুন পার্ক, ছাদবাগান, উল্লম্ব বাগান (Vertical Greenery), জলাধার সংরক্ষণ, প্রতিফলক নির্মাণসামগ্রী (Cool Roof), ছায়াবহুল হাঁটার পথ, এসব কেবল পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ নয়; এগুলো জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিরও বিনিয়োগ।

জলবায়ু অভিযোজন হবে নতুন অর্থনীতি। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা, উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা—এসব ক্ষেত্রে দেশটি অনেক অগ্রগতি করেছে। কিন্তু ভবিষ্যতের অভিযোজন আরও বিস্তৃত হতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন— তাপসহনশীল ধানের জাত, খরাসহিষ্ণু কৃষি, স্মার্ট সেচ, সৌরশক্তির বিস্তার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলবায়ু সহনশীল নগর অবকাঠামো। জলবায়ুর সঙ্গে লড়াই শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয়; এটি অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার কৌশল।

তরুণরাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি: বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো খনিজ নয়। এটি তার মানুষ। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী। যদি এই জনগোষ্ঠী— সুস্থ থাকে, দক্ষতা অর্জন করে, বিশ্বমানের শিক্ষা পায়, গবেষণার সুযোগ পায়, উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবেশ পায়,তাহলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা অনেকটাই অতিক্রম করা সম্ভব। আজ বিশ্বের বহু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন দেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ খুবই সীমিত। তাদের মূল সম্পদ মানুষের মেধা। বাংলাদেশও সেই পথ বেছে নিতে পারে।

ভূগোল কি তাহলে ভাগ্য লেখে?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। ভূগোল একটি দেশের কৃষি, রোগব্যাধি, জ্বালানি, পরিবহন, উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
জলবায়ুও মানুষের জীবনকে সহজ বা কঠিন করে তুলতে পারে। কিন্তু ইতিহাস দেখিয়েছে, ভূগোল কোনো দেশের চূড়ান্ত নিয়তি নয়।
জাপান ভূমিকম্পের দেশ। নেদারল্যান্ডসের বড় অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। সিঙ্গাপুরে নেই প্রাকৃতিক সম্পদ। ইসরায়েলের বড় অংশ মরুভূমি।
তবু তারা উন্নত। অন্যদিকে বিপুল খনিজসম্পদ থাকা বহু দেশ এখনও দারিদ্র্য ও অস্থিতিশীলতার সঙ্গে লড়ছে। পার্থক্য গড়ে দিয়েছে মানুষ—তার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, বিজ্ঞান, নীতি এবং নেতৃত্ব।

পুরানা পল্টনের সেই রিকশাচালক আবুল কাসেমের ঘাম আর বোস্টনের গবেষণাগারের বিজ্ঞানীর চিন্তার মধ্যে দূরত্ব হাজার হাজার কিলোমিটারের। কিন্তু তার চেয়েও বড় দূরত্বটি তৈরি হয়েছে শতাব্দীর ইতিহাস, শিল্পবিপ্লব, উপনিবেশবাদ, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের কারণে। জলবায়ু হয়তো একজন শ্রমিকের কাজকে কঠিন করে তোলে, কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। একুশ শতকে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্পদ আর সোনা, তেল বা কয়লা নয়।

সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো-মানুষের মেধা। যে রাষ্ট্র তার মানুষকে সুস্থ রাখে, শিক্ষা দেয়, গবেষণায় বিনিয়োগ করে, আইনের শাসন নিশ্চিত করে এবং উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করে—সেই রাষ্ট্রই এগিয়ে যায়, সে নিরক্ষরেখার কাছেই হোক কিংবা তুষারে ঢাকা উত্তরের কোনো দেশে। হয়তো একদিন বাংলাদেশের কোনো গরম দুপুরেও আবুল কাসেমের নাতি এমন এক গবেষণাগারে বসে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো পৃথিবীতে। সেদিন প্রমাণ হবে, ভূগোল মানুষের যাত্রাপথকে কঠিন করতে পারে, কিন্তু গন্তব্য ঠিক করার অধিকার শেষ পর্যন্ত মানুষের হাতেই থাকে।

লেখক:

বাপ্পি লিংকন রায়
সাংবাদিক ও শিক্ষক

(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বাপ্পি/সা.এ

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]