রাশিয়ার হুমকির মধ্যে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো যখন ক্রমেই ন্যাটোর ওপর নির্ভরশীল, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভূমিকা কমানোর সম্ভাবনা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তবে এখনই ন্যাটো ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি বলে রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্প ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য চাপ দিয়ে আসছেন এবং ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর হুমকিও দিয়েছেন। তবে ইউরোপ থেকে বড় ধরনের মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এখনও হয়নি। বরং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো ঘাঁটিগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বহাল রয়েছে।
রোমানিয়ার মিহাইল কোগালনিচেনু বিমানঘাঁটি এর একটি উদাহরণ। গত বছর সেখানে থাকা প্রায় ২ হাজার মার্কিন সেনার প্রায় অর্ধেক চলে যায়। এতে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে চলতি বছরের জুলাইয়ে রয়টার্সের সাংবাদিকরা ওই ঘাঁটিতে নয়টি মার্কিন কেসি-১৩৫ ট্যাংকার বিমান দেখতে পান। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় মার্কিন যুদ্ধবিমান ও বোমারু বিমানকে জ্বালানি সরবরাহে এগুলো মোতায়েন করা হয়েছিল। দুই মাসেরও বেশি সময় পরও বিমানগুলো সেখানে ছিল।
রয়টার্সের ৫০ জনের বেশি বর্তমান ও সাবেক পশ্চিমা কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে করা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ট্রাম্পের চাপের কারণে ৩২ সদস্যের ন্যাটো জোটে টানাপোড়েন বেড়েছে। তবে জোটটি এখনো ভেঙে পড়েনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উভয় দলের রাজনীতিক এবং ইউরোপে বড় ব্যবসা থাকা মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো থেকে প্রত্যাহার ঠেকানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নয়জন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এমন তথ্য জানিয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের ন্যাটো নীতির প্রভাব ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় পড়ছে। ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য অংশীদার থাকবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। এর ফলে প্রতিরক্ষা ব্যয়, অস্ত্র কেনাকাটা এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, কানাডা, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক ও স্পেনসহ অন্তত আটটি ন্যাটো সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা কোম্পানির ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। এর ফলে ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পের চাপের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ফল হতে পারে—কিছু মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যেতে পারে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, গত জুনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইউরোপে প্রায় ২৫ হাজার মার্কিন সেনা কমানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে প্রশাসনের ভেতরেই এর বিরোধিতা হয়। এই সেনা কমানো হলে ইউরোপে মার্কিন সেনার সংখ্যা কংগ্রেস নির্ধারিত ৭৬ হাজারের ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে যেত।
শেষ পর্যন্ত হেগসেথ সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা না দিয়ে ইউরোপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়ে ছয় মাসের পর্যালোচনার ঘোষণা দেন। তিনি ন্যাটোর সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনের সময় যারা ‘না, হয়তো বা অপেক্ষা করুন’ ধরনের অবস্থান নেবে, তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হবে।
আগস্টে পেন্টাগন মিত্র দেশগুলোর জন্য ৫৭টি প্রশ্নসংবলিত একটি নথি প্রস্তুত করে। রয়টার্সের হাতে আসা ওই নথিতে সামরিক, আর্থিক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি রাজনৈতিক অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়নের প্রশ্ন রাখা হয়। এর একটি প্রশ্ন ছিল, সংশ্লিষ্ট দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে কি না।
এদিকে, হেগসেথের ন্যাটো নীতি নিয়েও মার্কিন কংগ্রেসে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কংগ্রেশনাল সহকারী—রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলের—রয়টার্সকে বলেছেন, ন্যাটো বিষয়ে হেগসেথের ভূমিকা নিয়ে দ্বিদলীয় অবিশ্বাস বাড়ছে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস অবশ্য বলেছেন, ট্রাম্প ন্যাটোর জন্য অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে বেশি কাজ করেছেন এবং তিনি সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ট্রাম্পের চাপের ফলে ইউরোপে প্রতিরক্ষা ব্যয় ও নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রবণতা জোরদার হলেও একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার সংকটও তৈরি হয়েছে। ফলে ন্যাটোর ৭৭ বছরের ইতিহাসে জোটটি একদিকে সামরিকভাবে আরও ব্যয়বহুল ও স্বনির্ভর হওয়ার পথে এগোলেও অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর