রাত সাড়ে ১১টা। কক্সবাজার শহরের প্রধান সড়কের ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন এলাকায় সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক সিএনজি অটোরিকশা। একেকজন চালক গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে যাচ্ছেন লাইনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে। কারও কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ২০ টাকা, কারও কাছ থেকে ৪০ টাকা। টাকা নেওয়ার পরই মিলছে সিরিয়াল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমছে না টাকা তোলার ব্যস্ততা। বরং গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই কার্যক্রম।
শুধু প্রতিদিনের টাকা নয়, কক্সবাজারের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী সিএনজি অটোরিকশার বড় একটি অংশের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে মাসিক ‘লাইন’ বা ‘কোম্পানি’ খরচ।
পরিবহনসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও চালকের ভাষ্য, বৈধ গাড়ির ক্ষেত্রে মাসে প্রায় ১ হাজার টাকা এবং ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন কিংবা চালকের বৈধ লাইসেন্স না থাকা গাড়ির ক্ষেত্রে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
চালকদের অভিযোগ, এই মাসিক চুক্তির বিনিময়েই অনেক কাগজপত্রহীন গাড়ি নির্বিঘ্নে সড়কে চলাচল করছে। চেকপোস্টে গাড়ি আটক হলেও ‘লাইন’ বা ‘কোম্পানির গাড়ি’ পরিচয় দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
এই টাকা আদায়ের নেটওয়ার্কের সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের কয়েকজন সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। আর অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন কক্সবাজার ট্রাফিক পুলিশের টিআই (অ্যাডমিন) খসরু পারভেজ।
অনুসন্ধানে কথা হয়েছে কক্সবাজারের বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী একাধিক সিএনজি চালক, লাইনম্যান ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে। তাদের প্রায় সবার বক্তব্যে উঠে এসেছে একই ধরনের তথ্য। মাসিক টাকা দিলে গাড়ি চালানো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ, আর টাকা না দিলে শুরু হয় মামলা, জব্দ ও হয়রানির আশঙ্কা।
মুরাদ নামের এক সিএনজি চালক বলেন, তার গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে। তবে ট্রাফিক পুলিশের টিআই খসরু পারভেজের সামনে পড়লে ‘লাইন ঠিক আছে কি না’ জানতে চাওয়া হয়।
মুরাদের ভাষ্য, লাইন মানে মাসে মাসে খসরু স্যারদের কিছু লোক আছে, তাদের হাতে টাকা দিলে আর ঝামেলা করে না।
আরেক চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার গাড়ি একবার খসরু পারভেজ আটক করেছিলেন। কাগজপত্র দেখাতে সামান্য দেরি হওয়ায় তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চালকদের এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন রুটে ‘কোম্পানি’ বা ‘লাইন’ নামে আলাদা আলাদা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব লাইনের মাধ্যমে গাড়ির সিরিয়াল, দৈনিক টাকা এবং মাসিক অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার শহর ও জেলার বিভিন্ন রুটে কয়েক হাজার সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করে। এর একটি বড় অংশের ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন অথবা চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, এসব গাড়িকে বিভিন্ন ‘লাইন’ বা ‘কোম্পানি’র আওতায় এনে মাসিক চুক্তিতে চালানো হয়।
তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেবানল পাল ওরফে নিউটন নামে একজন এই ব্যবস্থার অন্যতম নিয়ন্ত্রক। তার নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই হাজার অবৈধ সিএনজি রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। মাঠপর্যায়ে শাহাবুদ্দিন, শাহাজান, শহিদুল্লাহ, ভূট্টো, আমান উল্লাহ, মমতাজ ও ছালামতসহ কয়েকজন বিভিন্ন লাইন পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বাস টার্মিনাল থেকে রামু পর্যন্ত রুটের নিয়ন্ত্রণ শাহাজানের হাতে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তার অধীনে প্রায় এক হাজার সিএনজি রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
লিংক রোড হয়ে মরিচ্যা, কোর্টবাজার ও উখিয়া পর্যন্ত রুটে ‘এ প্লাস’ নামে একটি চক্র পরিচালনা করেন শহিদুল। এই লাইনে ৮০০ থেকে ৯০০ সিএনজি রয়েছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্টদেরা। অন্যদিকে কক্সবাজার-চকরিয়া রুটে ভূট্টো, আমান উল্লাহ ও মমতাজের নিয়ন্ত্রণে আরও প্রায় এক হাজার গাড়ি রয়েছে বলে তাদের ভাষ্য।
দেবানল পাল ওরফে নিউটনের সঙ্গে কথা বলে টাকা নেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেননি। নিউটন বলেন, হ্যাঁ, আমরা টাকা নিই। সব টাকা তো আমরা নিই না। ট্রাফিকের দায়িত্বে নিয়োজিত টিআই, টিএসআই, সার্জেন্টসহ অন্তত ২০ জন পুলিশকে ম্যানেজ করতে হয়।
তার দাবি, অবৈধ গাড়ি শহরে ঢুকলে ট্রাফিক পুলিশ আটক করে। তাই আগেই টাকা দিয়ে রাখতে হয়।
নিউটনের ভাষ্য অনুযায়ী, বাহারছড়া এলাকার শাহাজান তার নিয়ন্ত্রিত টাকার ভাগে বসেছেন এবং নিজেও একটি লাইন পরিচালনা করছেন। তবে পুলিশের সদস্যদের ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্ব তারই বলে দাবি করেন নিউটন। শাহাজান ও সাহাব উদ্দিনও ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের টাকা দেওয়ার কথা বলেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
তাদের ভাষ্য, আগে পুরো ট্রাফিক বিভাগকে ম্যানেজ করতে মাসে এককালীন ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা দিতে হতো। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের সরাসরি মাসিক টাকা দিতে হয়।
তাদের দেওয়া তথ্যে, টিআইদের ৩০ হাজার এবং সার্জেন্ট ও টিএসআইদের ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা খরচ হয় বলে তারা দাবি করেছে।
অনুসন্ধানের সময় নিউটন ও শাহাজানের কাছ থেকে ট্রাফিক পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা ও সদস্যের নামে মাসিক টাকা দেওয়ার একটি তালিকা পাওয়ার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাস টার্মিনাল এলাকার সিএনজি চালক সোলাইমানের তিনটি গাড়ি রয়েছে। তার দাবি, প্রতিটি গাড়ির জন্য মাসে ২ হাজার টাকা করে দিতে হয়। সোলাইমান বলেন, সম্প্রতি জেলগেট পুলিশ লাইনসংলগ্ন একটি চেকপোস্টে তার একটি গাড়ি আটক করা হয়। পরে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট মাঈন উদ্দিনকে ‘কোম্পানির গাড়ি’ পরিচয় দেওয়ার পর সেটি ছেড়ে দেওয়া হয়।
খুরুশকুলের চালক ফরিদ বলেন, আগে তিনি শাহাজানের মাধ্যমে গাড়ি চালাতেন। বর্তমানে পুলিশের এক সদস্যের মাধ্যমে মাসিক চুক্তিতে গাড়ি চালান। এ জন্য মাসে ১ হাজার ৮০০ টাকা দিতে হয় বলে জানান তিনি। লালদিঘীর পাড় ও প্যানোয়া সড়কের কয়েকজন চালকের ভাষ্য, তাদের লাইনে প্রায় ৭০টি সিএনজি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০টি লাইসেন্সবিহীন। বাহারছড়া-শাপলাপুর থেকে কক্সবাজার রুটে চলাচলকারী এসব গাড়ির কাছ থেকে মাসে ২ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলে তারা দাবি করেছেন।
মাসিক চুক্তির বাইরে শহরের প্রধান সড়কের ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন সিএনজি থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সড়কের একটি অংশে গড়ে উঠেছে অনানুষ্ঠানিক সিএনজি পার্কিং ও সিরিয়াল ব্যবস্থা।
চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি গাড়ি থেকে প্রতিদিন ৪০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০ টাকা ‘লাইন খরচ’ এবং ২০ টাকা পৌরসভার খরচ হিসেবে নেওয়া হয়। এই টাকা সংগ্রহের সঙ্গে মোহাম্মদ বেলাল নামের এক লাইনম্যান জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
বেলাল টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, এটি লাইন খরচের টাকা। গাড়িগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সিরিয়াল দিয়ে ২০ টাকা করে নিচ্ছি।
সড়কের ওপর এ ধরনের পার্কিং ও সিরিয়াল ব্যবস্থার সরকারি অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন মিলে করছি। চলতে হবে তো।
শুধু সিএনজি নয়, কক্সবাজারের সড়কে চলাচলকারী ডাম্পার নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দাবি, কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক অবৈধ ডাম্পার চলাচল করছে। তাদের দেওয়া তথ্যে প্রায় দুই হাজার ডাম্পার রয়েছে।
তাদের দাবি, এর মধ্যে অল্পসংখ্যক ডাম্পারের নিবন্ধন রয়েছে এবং নিবন্ধিত কয়েকটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এসব গাড়ির কাছ থেকে মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার টাকা টিআই খসরু পারভেজের কাছে পৌঁছায় বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
সরেজমিনে কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা যায়, অনুমোদনহীন ও অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত প্রায় হাজারখানেক টমটম ও মিশুক অবাধে চলাচল করছে। ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাজারকেন্দ্রিক এলাকায় এসব যানবাহনের দাপট চোখে পড়ার মতো।
কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা বৈধ অনুমোদন না থাকলেও নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার বিনিময়ে তারা সড়কে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চালকদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের কাছে নিয়মিত টাকা পৌঁছে দেওয়ার কারণে অনেকটা নির্বিঘ্নেই চলতে পারছেন তারা।
চালকদের আরও অভিযোগ, মাঝেমধ্যে ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে এসব অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অভিযানের সময় কিছু গাড়ি আটক বা মামলা দেওয়া হলেও পরে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে টাকা দিয়ে কিংবা নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার শর্তে আবারও সড়কে নামার সুযোগ মেলে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চালক। তাদের দাবি, ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক (টিআই) মো. খসরু পারভেজের নেতৃত্বে লোক দেখানো অভিযান চালানোর পরও অল্প সময়ের মধ্যে আগের চিত্র ফিরে আসে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, টিআই খসরুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অভিযোগ শুনেছি। কক্সবাজারে প্রায় হাজার খানেক অবৈধ ডাম্পার চলে। কিন্তু একটি ডাম্পারও কখনো জরিমানা কিংবা জব্দ করতে দেখিনি। কারণ, সেখান থেকে নিয়মিত মাসোহারা নেওয়া হয়। একই অবস্থা শহরের টমটম মিশুক গাড়ির ক্ষেত্রেও দেখা যায় মাসিক মাসোহারায় চলছে কয়েক শত টমটম মিশুক। ট্রাফিক বিভাগের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হচ্ছে প্রতিদিন গুটিকয়েক এসব টমটম মিশুক গাড়িতে জরিমানা করা হলেও জরিমানার স্লিপে টাকার অঙ্ক লিখা থাকেনা। তারমধ্যে খসরু মতো ট্রাফিক পুলিশের কারণে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাকে দ্রুত কক্সবাজার থেকে প্রত্যাহার করে ট্রাফিক বিভাগের শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি বলে মনে করছি।
অন্যদিকে পরিবহনসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের হিসাবে, বিভিন্ন রুটে সক্রিয় গাড়ির সংখ্যা, বৈধ-অবৈধ গাড়ির পার্থক্য এবং অন্যান্য যানবাহন থেকে আদায় করা অর্থ মিলিয়ে ট্রাফিক পুলিশের নামে মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়।
পরিবহনসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, বিভিন্ন রুটের ‘লাইন’ ও ‘কোম্পানি’ থেকে আদায় করা অর্থের একটি অংশ মাস শেষে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়। তাদের দাবি, এই অর্থের একটি বড় অংশ টিআই (অ্যাডমিন) খসরু পারভেজের কাছে পৌঁছে যায় এবং তার মাসিক প্রাপ্তির পরিমাণ ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা।
অভিযোগের বিষয়ে টিআই (অ্যাডমিন) খসরু পারভেজের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেন, মাসোহারার বিষয়ে যদি কোনো তথ্য-প্রমাণ থাকে, নিউজ করে দেন।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, ট্রাফিক পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি আমি সিরিয়াসলি দেখছি। এবং এসপি স্যারের সাথেও বিষয়টি শেয়ার করছি।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর