দেশে সাইবার অপরাধ বাড়তে থাকায় পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও তদন্ত দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী অক্টোবরে এসব ল্যাব উদ্বোধনের কথা রয়েছে।
কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস ও নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অন্যান্য সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত ‘সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট’ গঠনের কাজও চলছে।
সিআইডি জানিয়েছে, বিশেষায়িত সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের জন্য গত ২১ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সাইবার অপরাধ দমনে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চলছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। উন্নত প্রযুক্তি ও ল্যাব পরিদর্শনের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
এক বছরে ১৯১ মামলা, গ্রেপ্তার ১০১
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধের ঘটনায় মোট ১৯১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জিআর মামলা ৩২টি এবং সিআর মামলা ১৫৯টি। এসব ঘটনায় এক বছরে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানি-সংক্রান্ত যেসব মামলা সিআইডিতে আসে, সেগুলো পেশাদারি ও আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, তদন্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এফটিআই) ও ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান প্রশিক্ষণে নতুন নতুন মডিউল যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তরের উদ্যোগে দেশব্যাপী সাইবার ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্সও চালু হয়েছে।
যেভাবে প্রতারণা করছে সাইবার অপরাধীরা
সিআইডির তথ্যমতে, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে অনুমতি ছাড়া অন্যের ফেসবুক, ই-মেইল বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে প্রতারণা করা হচ্ছে। ভুয়া লিংক ও ওয়েবসাইট তৈরি করে ব্যবহারকারীর পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
এ ছাড়া অন্যের পরিচয় বা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল এবং মানহানির মতো অপরাধও করছে সাইবার অপরাধীরা।
প্রশিক্ষণে জোর পুলিশের
সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তে পুলিশ কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে সম্প্রতি মিরপুরের পুলিশ স্টাফ কলেজে ১০ দিনের বিশেষ ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ কোর্স আয়োজন করা হয়। পর্যায়ক্রমে এতে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।
পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, অনলাইন প্রতারণা ও আর্থিক জালিয়াতি মোকাবিলায় পুলিশ বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
ডিএমপিতেও বাড়ছে সক্ষমতা
সাইবার অপরাধ দমনে ঢাকা মহানগর পুলিশও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে। পাশাপাশি কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটে একটি ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন হয়েছে। ডিজিটাল মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সাইবার অপরাধে রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলা ও ১৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। লালবাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারীতে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিলে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন, তেজগাঁওয়ে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন, মিরপুরে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশানে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে অনলাইন ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া লিংক ও আর্থিক প্রতারণা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে হ্যাকিং, আর্থিক প্রতারণা এবং নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে সংঘটিত সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নজরদারি ও সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর সর্বশেষ খবর