একসময় স্রোতস্বিনী মগড়া নদীতে পালতোলা নৌকা, স্টিমার ও লঞ্চ চলত। ধান-পাটসহ নানা পণ্য নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে নৌযান আসত নেত্রকোনায়। কালের বিবর্তনে সেই মগড়া এখন দখল, দূষণ ও বর্জ্যের চাপে অস্তিত্ব সংকটে। তবে দীর্ঘদিনের দাবির পর নদীটি পুনরুজ্জীবিত করন বড় ধরনের সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় নদী পুনঃখনন, পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা এবং নদীর অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং দূষণের উৎস বন্ধ করা।
প্রায় ৪৯ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) তথ্য অনুযায়ী, ‘নেত্রকোনা জেলার অন্তর্গত মগড়া নদী পুনঃখনন প্রকল্প’ অনুমোদন করা হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নভেম্বর ২০২৫ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত। এতে সরকারি ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮৪৯.৭৫ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৪৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, মগড়া নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ১১৬ কিলোমিটার পড়েছে নেত্রকোনা জেলার অংশে। নেত্রকোনা শহরের ভেতর দিয়ে নদীটির প্রায় সাত কিলোমিটার প্রবাহিত হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর-সাকুয়া বাজার এলাকা থেকে আটপাড়ার সেতুর বাজার পর্যন্ত প্রায় ৪১ কিলোমিটার নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন জানান, চলতি শুষ্ক মৌসুমে খননকাজ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। কয়েকটি প্যাকেজে কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের আওতায় জরিপসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে নদীর তীরে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও দখলমুক্ত করার বিষয়টি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হবে।
সিএস খতিয়ানে ৩৮১ অবৈধ স্থাপনা
মগড়া নদীর দুই তীরে দখলের চিত্র দীর্ঘদিনের। জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, সিএস খতিয়ান অনুযায়ী নদীর দুই পাড়ে অন্তত ৩৮১টি অবৈধ স্থাপনা শনাক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে বিআরএস অনুযায়ী এ সংখ্যা ৪৯টি। এসব দখলকে কেন্দ্র করে ১০৪টি উচ্ছেদ মামলা এবং ২০টি দেওয়ানি মামলা চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ কারণে নদী পুনঃখননের আগে সঠিক সীমানা নির্ধারণ এবং দখলমুক্ত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ দখলদারদের স্থাপনা বহাল রেখে নদী খনন করা হলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
গত ২ এপ্রিল ২০২৬ জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে মগড়া নদী পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের আওতায় অবৈধ দখল উচ্ছেদ বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মুশফিকুর রহমান।
হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নের অপেক্ষা
মগড়া নদী রক্ষায় উচ্চ আদালতেরও সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্ট নদীর মূল প্রবাহ বিবেচনায় সিএস ও আরএস ম্যাপের ভিত্তিতে নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে নদীতে পৌরসভা ও গৃহস্থালির পয়োবর্জ্য ফেলা বন্ধ, দূষণের উৎস চিহ্নিত এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ছয় মাসের মধ্যে আদালতে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দাখিলের কথাও বলা হয়েছিল।
ফলে একদিকে প্রায় ৪৯ কোটি টাকার সরকারি পুনঃখনন প্রকল্প, অন্যদিকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা—দুই দিক থেকেই মগড়া উদ্ধারের পথ তৈরি হয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন, এসব উদ্যোগ মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
১৩ নর্দমার পানি পড়ছে নদীতে
দখলের পাশাপাশি মগড়া নদীর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে দূষণ। শহরের বিভিন্ন বাজার, বাসাবাড়ি, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও অন্যান্য উৎসের বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে , নেত্রকোনা পৌরসভার ১৩টি নর্দমার পানি সরাসরি মগড়া নদীতে গিয়ে পড়ছে।
নদীর বিভিন্ন স্থানে কাঁচা শাকসবজির বর্জ্য, গৃহস্থালির আবর্জনা, কারখানা ও ক্লিনিকের বর্জ্য জমে থাকার চিত্রও দেখা যায়। এতে নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দূষণ বাড়ছে এবং নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু নদী খনন করলেই মগড়ার প্রাণ ফিরবে না। খননের পরও যদি নর্দমার পানি ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য নদীতে পড়তে থাকে, তাহলে আবারও পলি জমে নাব্যতা কমবে এবং নদী দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
শুধু খনন নয়, প্রয়োজন স্থায়ী ব্যবস্থাপনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মগড়া নদীকে বাঁচাতে একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত নদীতে বর্জ্য ও নর্দমার পানি পড়া বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত পরিকল্পিতভাবে পুনঃখননের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি খননের পর নিয়মিত নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
নেত্রকোনা শহরের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত মগড়া শুধু একটি নদী নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহরের পরিবেশ, জলাবদ্ধতা, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতি। একসময় নদীটি ছিল নৌপথ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। নাব্যতা কমে যাওয়ায় এখন বড় নৌযান চলাচল প্রায় বন্ধ।
প্রকল্প বাস্তবায়নেই এখন বড় পরীক্ষা
প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পটি মগড়া নদীর জন্য নিঃসন্দেহে বড় সুযোগ। তবে শুধু প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও খননকাজ শেষ করলেই নদীর পুনরুজ্জীবন নিশ্চিত হবে না। দখলদার উচ্ছেদ, নদীর সীমানা সংরক্ষণ, বর্জ্য ফেলা বন্ধ এবং খননের পর পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
নদী রক্ষায় জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পৌরসভা, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে।
মগড়া নদীর পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের সফলতার আসল পরীক্ষা এখন মাঠপর্যায়ে। বিপুল অর্থের এই প্রকল্প শেষ পর্যন্ত নদীর বুক থেকে দখল-দূষণের বোঝা সরিয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে দিতে পারে কি না—সেটিই এখন নেত্রকোনাবাসীর বড় প্রত্যাশা। নইলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও মগড়া নদী থেকে যেতে পারে দখল ও দূষণের চক্রেই।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর