ফরিদপুরের নগরকান্দায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়াতে একটি আধুনিক সরকারি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের অভিযোগ, উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞানচর্চার জন্য কার্যকর কোনো পাবলিক লাইব্রেরি নেই। ২০২৩ সালে উদ্বোধন করা গণগ্রন্থাগারটিও নিয়মিত পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত থাকে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
নগরকান্দা পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি (এম.এন. একাডেমি), সরকারি নগরকান্দা কলেজ ও শহীদ আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দুটি কওমি মাদ্রাসা। এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকদের জন্য নিয়মিত বই পড়া এবং জ্ঞানচর্চার উপযোগী উন্মুক্ত পরিবেশের অভাব রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার ‘বঙ্গবন্ধু পাবলিক লাইব্রেরি’ নামে একটি গণগ্রন্থাগার উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের পর থেকেই এটি নিয়মিত পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাঠাগারটির নাম পরিবর্তন করে ‘জিয়া পাবলিক লাইব্রেরি’ রাখা হয়েছে বলেও জানান তাঁরা। তাঁদের প্রশ্ন, নাম পরিবর্তনের পাশাপাশি পাঠাগারটির কার্যক্রমেও কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি জায়গায় পুরোনো ও পরিত্যক্ত একটি ভবনে পাঠাগারটি স্থাপন করা হলেও সেখানে নিয়মিত পাঠ কার্যক্রম গড়ে ওঠেনি। ফলে শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না। এ অবস্থায় পুরোনো ভবনটি ভেঙে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি সরকারি গণগ্রন্থাগার নির্মাণের দাবি জোরালো হচ্ছে।
স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, দর্শন, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও সাধারণ জ্ঞানবিষয়ক বই পড়ার সুযোগ শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও চিন্তার পরিধি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর বর্তমান সময়ে একটি আধুনিক পাঠাগার তরুণদের বিকল্প জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বই পড়ার পাশাপাশি আলোচনা, বিতর্ক, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে এটি একটি সক্রিয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। তাঁদের দাবি, নতুন ভবনে পাঠাগার স্থাপনের পাশাপাশি চাকরি ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির বই, জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকা, সাময়িকী এবং শিশু-কিশোরদের উপযোগী বইয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠক—উভয়ই উপকৃত হবেন।
এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী শরীফ বিডি২৪লাইভকে বলেন, “নগরকান্দায় কোনো গণগ্রন্থাগার না থাকায় স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়াশোনার সুযোগ নেই। পড়াশোনা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটাতে একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে প্রচুর বই পড়া দরকার। কিন্তু নগরকান্দায় এমন কোনো পরিবেশ নেই। কাজেই নগরকান্দায় একটি আধুনিক গণগ্রন্থাগার স্থাপনের দাবি জানাই।”
নগরকান্দা সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমির অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও লেখক মো. ইব্রাহিম খান বিডি২৪লাইভকে বলেন, “গ্রন্থাগার জ্ঞানার্জনের শ্রেষ্ঠ জায়গা। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নগরকান্দা উপজেলায় অদ্যাবধি কোনো গ্রন্থাগার গড়ে ওঠেনি। শিক্ষার্থী ও জ্ঞানপিপাসু মানুষের জন্য নগরকান্দা উপজেলা সদরে একটি সরকারি গণগ্রন্থাগার একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্মকে অপসংস্কৃতি, আকাশসংস্কৃতি ও মাদক থেকে দূরে রেখে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গণগ্রন্থাগার বিশেষ ভূমিকা রাখবে। তাই নগরকান্দা উপজেলা সদরে একটি সরকারি গণগ্রন্থাগার স্থাপনের দাবি জানাই।”
নগরকান্দা সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ কে এম মুজাহিদুর রহমান বিডি২৪লাইভকে বলেন, “শিক্ষার্থী ও যুবসমাজকে মাদকাসক্তি ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার থেকে দূরে রেখে জ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হলে প্রয়োজন সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা। তাই সময়ের দাবি—নগরকান্দায় একটি সরকারি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করা হোক।”
এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বিডি২৪লাইভকে বলেন, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির পুরোনো ভবনটি ভেঙে সেখানে তিনতলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবনটির একটি তলায় শিল্পকলা একাডেমি, একটিতে পাবলিক লাইব্রেরি এবং অন্যটিতে অফিসার্স ক্লাব স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে আপাতত পুরোনো পাবলিক লাইব্রেরিটি সংস্কারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, গণগ্রন্থাগার কেবল বই রাখার স্থান নয়; এটি একটি এলাকার জ্ঞানচর্চা, মননশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই নগরকান্দায় একটি আধুনিক সরকারি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সেটির নিয়মিত কার্যক্রম নিশ্চিত করাও জরুরি। নাম যা-ই হোক, পাঠাগারটি যেন সত্যিকার অর্থেই ‘পাবলিক লাইব্রেরি’ হয়ে ওঠে—যেখানে প্রতিদিন বই হাতে বসার সুযোগ পাবেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠক।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর