চোখের সামনে আগুনের ভয়াবহতা, চারদিকে ধোঁয়া আর বাঁচার আকুতি। প্রাণ বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত জানালা দিয়ে লাফ দেন আশিকুল ইসলাম আশিক। বেঁচে ফিরেছেন তিনি, কিন্তু হারিয়েছেন স্ত্রীসহ তার পরিবারের আট সদস্যকে। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজনদের হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছেন আশিক। কথা বলার শক্তি হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শুধু জানালেন, তিনজনের মরদেহ পেয়েছেন, এখনো খোঁজ নেই বাকি ছয়জনের।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় অবস্থিত টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। এতে তিন শিশুসহ অন্তত ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় একই পরিবারের নয়জন রিসোর্টটিতে অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে আশিক জানালা দিয়ে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচলেও তার স্ত্রীসহ পরিবারের আট সদস্যের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
অগ্নিকাণ্ডস্থলে আশিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিবেদক। স্ত্রীকে হারানোর শোকে কাতর আশিক তখন হতভম্ব। কথা বলার শক্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। তবু স্বজনদের পরিণতি নিয়ে বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
আশিক বলেন, ‘ওই রিসোর্টে আমি, আমার স্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যসহ মোট নয়জন ছিলাম। আমি তিনজনের মরদেহ হাতে পেয়েছি। বাকি ছয়জনকে জীবিত বা মৃত এখনো খুঁজে পাইনি।’
মারা যাওয়া অন্য ব্যক্তিরা তার কে হন, জানতে চাইলে আশিক বলেন, তারা তার স্ত্রীর পরিবারের সদস্য।
শনিবার সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত হয়। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি তিনতলা ভবনটিতে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে সকাল ৮টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে ভবনের ভেতরে আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধারে তল্লাশি চালানো হয়।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন শনিবার দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে নতুন করে চারটি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে আরও ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ জনে।
নিহতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। তারা হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩), ফায়িজান আহম্মেদ (৫) এবং ঢাকা জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতির স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তা।
নাসরিন আক্তার মুক্তা আশুলিয়ার ‘স্বপ্ন বিলাস’ নামের একটি স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী শিশুও রয়েছে। বাকি তিনজনের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছিল।
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তারা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল। শুক্রবার রাতে তিনটি কক্ষের পর্যটকেরা চেকআউট করে চলে যান। বাকি ছয়টি কক্ষে ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়জন শনিবার সকালে বিভিন্ন কাজে বাইরে বেরিয়ে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ভবনের ভেতরে থাকা পর্যটকদের অনেকে আগুনের মধ্যে আটকা পড়েন। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ায় তাদের কয়েকজন বের হতে পারেননি। আশিক জানালা দিয়ে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচলেও তার পরিবারের আট সদস্যের পরিণতি তাকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছিল না। এ কারণে চলতি বছরের জুন মাসে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল।
মহাপরিচালক জানান, রিসোর্টটির নিচতলায় রান্নাঘর এবং ওপরের তলাগুলোতে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেও আগুনের সূত্রপাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। রান্নাঘরে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। আগুন লাগার পেছনে কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের সবাই পালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
পর্যটনকেন্দ্রিক ইনানীতে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল এবং সতর্ক করার পর কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা জরুরি।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর