নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলি করে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। অন্যদিকে, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে ছায়াতদন্ত শুরু করেছে এসআরবি-১৪, ময়মনসিংহ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থা মাঠে নেমেছে।
হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলা দায়ের ও গোয়েন্দা তৎপরতা শুরু হলেও এখনো হত্যার কারণ এবং জড়িতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এসআরবি-১৪, ময়মনসিংহের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মাসুদ রানা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজুল ইসলাম। এ সময় তাঁরা ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।
অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মাসুদ রানা সাংবাদিকদের বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের ছায়াতদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হচ্ছে। প্রশাসন, গোয়েন্দা বিভাগ, এসআরবি-১৪সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। ঘটনাস্থলে গুলির খোসা পাওয়া গেছে। হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা থাকলে তা দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য সাংবাদিক সহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় তথ্য দেওয়ার জন্য একটি হটলাইন নম্বরও প্রদান করা হয়।
এদিকে, ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর শুক্রবার নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলাটি ২৩ নম্বরে নথিভুক্ত হয়েছে।
মামলার পর স্বামী হত্যায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন আনন্দিতা। শোকাহত স্ত্রী বলেন, ‘আমার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই। যারা আমার দুই সন্তানকে এতিম করেছে, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে ফাঁসি কার্যকর করা হোক। এমন শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর কোনো সন্ত্রাসী এভাবে কাউকে হত্যা করার সাহস না পায়।’
নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির ‘রূপসী বাংলা’ টেলিভিশনের নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন তিনি। তাঁর সাংবাদিকতা ও প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৮টার দিকে দুর্গাপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওই এলাকার চায়ের দোকানি রবিন রাংসার দোকানে আগে রেখে যাওয়া মুঠোফোন নিতে গিয়েছিলেন আলিফ ফকির। এ সময় দুই যুবক তাঁকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত পালিয়ে যায়।
পরে স্থানীয়রা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আলিফ ফকিরকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শী চায়ের দোকানি রবিন রাংসা জানান, ঘটনার আগে দুই ব্যক্তি তাঁর দোকানে এসে সিগারেট কেনেন। তাঁদের বয়স আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ বছর। একজনের পরনে লুঙ্গি এবং অন্যজনের পরনে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ছিল। পরে আলিফ ফকির মুঠোফোন নিতে দোকানে এলে ওই দুই ব্যক্তি সিগারেট নিয়ে তাঁর পিছু নেন। কিছুক্ষণ পর তিনি পরপর তিনটি গুলির শব্দ শুনতে পান। ভয়ে তিনি দোকান ছেড়ে বাড়ির ভেতরে চলে যান।
আনন্দিতা সাংমা জানান, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন। স্বামীকে গুলি করে হত্যার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে স্বামীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আলিফ ফকির নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের শুনুই গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মহব্বত আলী ফকির। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে দুর্গাপুরের তেলুঞ্জিয়া এলাকায় বসবাস করতেন।
সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ও এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এখন তাঁদের প্রধান দাবি—হত্যার পেছনের কারণ উদ্ঘাটন, হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত এবং দ্রুত গ্রেপ্তার। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করারও দাবি উঠেছে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর