নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা সীমান্ত এলাকায় অপরাধজগতের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসী তৎপরতা, খুনোখুনি, মাদক কারবার ও চোরাচালানের অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক অপরাধী চক্র। এসব অভিযোগের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজুল’-এর নাম।
সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। এ হত্যাকাণ্ডের পর জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আলটিমেটাম দেয় সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশসহ স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীরা। এর ধারাবাহিকতায় ১৭ অক্টোবর রাতে অভিযান চালিয়ে অপূর্ব (২১) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে দুর্গাপুর থানা-পুলিশ।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ জানান, সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অপূর্বকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, অপূর্ব ২০২৫ সালে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় দুর্গাপুর পৌর শহরের উকিলপাড়া এলাকার পান মহালের একটি গলিতে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় গুরুতর আহত হন এসআই শফিকুল ইসলাম (৪৫)। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন কেনাকাটা করতে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন শফিকুল। এ সময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাঁকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। তাঁর চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং অবস্থার অবনতি হলে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ফারহানা আক্তার সুমি সে সময় জানিয়েছিলেন, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে শফিকুলের ডান পায়ের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও গুরুতর জখম ছিল এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছিল। তিনি জামালপুর পুলিশ লাইন্সের বেতার শাখায় কর্মরত ছিলেন এবং ছুটিতে নিজ বাড়ি দুর্গাপুরে এসেছিলেন।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, সাংবাদিক আলিফকে লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা আগে থেকেই করা হয়ে থাকতে পারে। এমনকি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এসআই শফিকুলের ওপর হামলার ঘটনার সঙ্গেও আলিফকে লক্ষ্যবস্তু করার একটি সম্ভাব্য যোগসূত্রের অভিযোগ সামনে এসেছে। তাঁদের দাবি, শফিকুল ও আলিফের চেহারায় মিল থাকায় হামলাকারীরা ভুলবশত পুলিশ কর্মকর্তাকে আক্রমণ করে থাকতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত-তথ্য বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় মাদক পাচার, চোরাচালান এবং অস্ত্রধারী অপরাধীদের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত বিভিন্ন চক্রের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, তাজুল ইসলাম ওরফে ‘কিলার তাজুল’-কে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে কথিত ওই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা, সাংগঠনিক কাঠামো, মাদক ও চোরাচালানে সংশ্লিষ্টতা কিংবা তাজুলের প্রত্যক্ষ ভূমিকার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া জরুরি।
এ ছাড়া সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডে অর্থের জোগানদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী, মাদক কারবারি কিংবা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির ইন্ধন ছিল কি না, তা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাংবাদিক আলিফ হত্যাকাণ্ডে অপূর্বর গ্রেপ্তার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সূত্রের সন্ধান দেয় কি না, তা নিয়ে এখন স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা চলছে। তাঁর বিরুদ্ধে এসআই শফিকুল হত্যা মামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং আলিফ হত্যাকাণ্ডে সম্ভাব্য ভূমিকা—দুটি বিষয়ই পৃথকভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাজুল ইসলাম ও তাঁর কথিত সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, আগের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র, অস্ত্রের উৎস এবং অপরাধে অর্থায়নের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
সাংবাদিক হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে শুধু সন্দেহভাজন কাউকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। হত্যার পরিকল্পনাকারী, অর্থের জোগানদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী ও সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। দুর্গাপুরের অপরাধজগতের নেপথ্যে কারা সক্রিয়, সাংবাদিক আলিফ হত্যার প্রকৃত কারণ কী এবং পুরোনো অপরাধের সঙ্গে নতুন ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও নির্ভুল তদন্তের ওপর। স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, কোনো প্রভাব বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর