এম. সুরুজ্জামান

শেরপুর প্রতিনিধি

‘দেশ পূর্ণাঙ্গ ভাবে স্বাধীন হয়নি’

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২০:৪৬:১১

ছবি: প্রতিনিধি

দেশ পূর্ণাঙ্গ ভাবে স্বাধীন হয়নি, কথাটি অপকটেই বললেন, বকরী চড়াতে কাঁধে বন্ধুক বহনকারী নারী পোষাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা জমশেদ আলী (জঙ্গু পাগলা)। স্বাধীনতার যুদ্ধে যারা বিরোধীতা করেছেন তারা আজও এ দেশে গর্বের সহিত জীবন যাপন করছেন। তাদের আছে বিশাল বাড়ী গাড়ী। অথচ দেশকে স্বাধীন করতে যে জঙ্গু জীবন বাজি রেখে ছিলেন। এই দেশে তার নামে এক শতাংশ জমি পর্যন্ত নেই। নেই নিজের কোন বাড়ী ঘর। এরশাদ সরকারের
আমলে বরাদ্দকৃত আদর্শ (গুচ্ছ) দগ্রামের একটি ঘরে পরিবার পরিজন নিয়ে রাত কাটান তিনি। এখন তার ছেলে মেয়ে বড় হওয়ায় ওই গুচ্ছ গ্রামের ঘরে একসাথে থাকা যায় না বলে তিনি এখন ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় অথবা চন্দ্রকোনা বাজারের কোন দোকানের বারান্দায় রাত কাটান।

জঙ্গুর দেওয়া তথ্যমতে, শেরপুরের নকলা উপজেলার বাছূরআলগা গ্রামের মৃত শমসের আলীর তিন ছেলে এক মেয়ের মধ্যে জমশেদ আলী (জঙ্গু পাগলা) ছোট। ১৯৪৭ সালে জন্ম গ্রহন করে ৫ (পাঁচ) বছর বয়সে তিনি বাবা হারা হন।
তৎকালীন আইনে পিতার আগে পুত্র মারাগেলে নাতি নাতনিরা বেওয়ারিশ হয়ে যেত। ওই আইনের ফাঁকে জমশেদ আলী ভূমিহীন হন। জীবন বাঁচাতে পেটের দায়ে কেচ্চা গানের বয়াতী হিসাবে তিনি আত্ম নিয়োগ করেন। বয়াতি হিসেবে খুব দ্রুত পরিচিতিও পেয়ে যান তিনি।

এমতাবস্থায় শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালে ১১নং সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের ও কোম্পানী কমান্ডার আবুল মনছুরের অধীনে বিভিন্নস্থানে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। ৯ ডিসেম্বর নকলাকে শত্র“ মুক্ত করেন তাঁরা।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত রক্ষী বাহিনীতে যোগদান করেন তিনি। চট্রগ্রাম ১নং ব্যাটালিয়নে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার সংবাদ পেয়ে সে কোমায় চলে যান। জ্ঞান ফিরলেও সে স্বাভাবিবক জীবনে আর ফিরতে পারেননি। ঐদিন থেকেই শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার বিচার চেয়ে আসছিলেন।

বিচার চাওয়ার অপরাধে তাকে দীর্ঘ্য দিন ডিপার্টম্যান্ট অব আর্মি কোয়ার্টার গার্ডে রাখা হয়। সেখানে থাকা অবস্থায় তার স্ত্রী অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যায়। ওই বছরই তার মাকে তিনি চিরতরে হারান। প্রথমে জন্মদাতা বাবা, তার পর ভূমিহীন, অত:পর আত্মীক বাবা বঙ্গবন্ধুকে এবং পর্যায়ক্রমে স্ত্রী ও মা সহ একে একে সব হারিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা জমশেদ আলী স্থায়ীভাবে মানসিক ভারসাম্যহ হারিয়ে ফেলেন।

অনেকদিন নিখোঁজ থাকার পরে অন্যের সহযোগিতায় নিজ গ্রামে ফিরে আসেন তিনি। পরে নাজিম উদ্দিন দম্পতি সর্বহারা জঙ্গুকে ছেলের আদরে রাখেন। সৎ, আদর্শ ও নির্লোভ জঙ্গুর কাছে তাদের মেয়ে জোসনা কে বিয়ে দেন। তার পর থেকে জঙ্গু গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে তার দুই ছেলে দুই মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছে।

জঙ্গুর সাথে কথা বলে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা ও শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা প্রমান করে দেশ এখনও পূর্ণাঙ্গ ভাবে স্বাধীন হয়নি। যতদিন পর্যন্ত এসবের বিচার না হবে, ততদিন পর্যন্ত সে কাঁদে কাঠের বানানো বন্ধুক রাখবেন। রক্তের চি‎হ্ন স্বরুপ সেলাই হীন লাল সালু পড়ে থাকবেন। গায়ে সাবান দিবেন না এবং নদীর স্রোতে গোসল করবেন। আজও তাই করে আসছেন তিনি।

তার কানে দুল আর হাতে চুড়ি পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যুদ্ধাপারাধীদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিজেকে বীর হিসেবে নয়, নারী হিসেবে মনে করি। যেদিন সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার কার্যশেষ হবে, সেদিন তিনি তার গায়ে জড়ানো নারীর সব পোশাক খোলবেন, নতুবা নয়।

পরিবারের ভরন পোষন বিষয়ে জানান, সরকারের দেয়া মুক্তিযোদ্ধা সম্মানি ভাতা ও বকরী পালনের আয় দিযে স্ত্রীকে সহযোগীতা করেন। তা দিয়েই তার স্ত্রী সংসার চালান। সংসার নিয়ে যেন তার কোন চিন্তা নেই। তার দুই সন্তান চন্দ্রকোনা রাজলক্ষী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়া লেখা করে। তার কথায় বুঝা যায়, সে সংসার ও নিজেকে নিয়ে চিন্তা না করলেও মহা চিন্তায় আছেন ঐ দুই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তার প্রশ্ন সন্তানরা পড়ালেখা করে কোন চাকুরী পাবেতো? সমাজে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারবেতো?

এ বিষয়ে স্থানীয়রা জানান, জঙ্গু একজন সৎ, সাহসী ও ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর সংবাদ শুনার পর থেকেই সে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে বলে তারা লোক মুখে শুনেছেন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা জমশেদ আলী (জঙ্গু পাগলা) জানিয়েছেন।

তবে সে মাঝে মধ্যে কথাবার্তা স্বাভাবিক মানুষের মতো করে ভালো ভাবেই বলতে পারেন। সমাজের কেউ কেউ তাকে পাগল বললেও সে হলো প্রকৃত ত্যাগী ও সংকল্প বাস্তবায়ন প্রণেতা। তার মতো সবাই ত্যাগ করতে পারলে দেশ আরও এগিয়ে থাকতো বলে মনে করছেন সুধীজন।

বিডি২৪লাইভ/এজে

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: