জাহিদুল ইসলাম

কুবি প্রতিনিধি

‘আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবায়নে নেই তেমন পদক্ষেপ’

১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:৫৩:০০

ছবি: প্রতিনিধি

স্বপ্ন যখন বাস্তবে পূরণ না হয় তখন সে স্বপ্নকে দিবা স্বপ্ন বলাটা দোষের কিছু নয়। ঠিক এমনই দিবা স্বপ্ন দেখিয়ে যাচ্ছেন কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের (কুবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী। যার কারনে তার কাছে ঘেঁসতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক তাকে ‘ডাইনামিক উপাচার্য’ বলে অভিহিত করে থাকেন। কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটাই দেখা যাচ্ছে।

জানা যায়, আগামী ৩১ জানুয়ারি উপাচার্য পদে নিয়োগ পাওয়ার এক বছর পূর্ণ করবেন ড. এমরান কবির চৌধুরী। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিশাল বিশাল স্বপ্ন দেখিয়ে ও লম্বা বক্তৃতা দিয়ে আর রাজনৈতিক দৌরাত্মের অবস্থান নিয়ে সময় পার করেছেন তিনি। সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের কথা ‘উপাচার্যের নিয়োগ পত্রে’ উল্লেখ থাকলেও কাজ থাকুক বা না থাকুক সপ্তাহের দুই থেকে তিন দিন তিনি রাজধানীতেই অবস্থান করেন। এমনকি তিনি যোগদান করার পর পূর্বের রেজিস্ট্রারকে সরিয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহেরকে রেজিস্ট্রারের চলতি দায়িত্বে নিয়ে আসেন। চলতি দায়িত্বের রেজিস্ট্রারও সপ্তাহের অনেক দিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান না করার কারণে প্রশাসনিক অনেক কাজই আটকে থাকে।

সিন্ডিকেট সভা হলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পরিষদ। এই সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠানের জন্য তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির আইনে। কিন্তু উপাচার্য যোগদানের পর তিনি তিন মাসের সময়সীমা না মেনে ইচ্ছে মত সময়ে সিন্ডিকেট সভা করেছেন। তার এই অনিয়মতান্ত্রিকতায় সঙ্গী হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাধিক শিক্ষক নেতা ও কর্মকর্তা। তৈরী করেছেন নিজের ইচ্ছেমত বিভিন্ন পদ ও পদবী। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় আইন বা সিন্ডিকেট অনুমোদন না করিয়ে দু’তিনজন শিক্ষককে নিজের বানানো বিশেষ উপদেষ্টার পদেও বসিয়েছেন। অথচ এমন পদের কথা উল্লেখ নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্গানোগ্রামে।

এদিকে শিক্ষার্থীদেরকে দেয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ১ বছরের মধ্যে না হওয়ায় বিষয়গুলো স্বপ্ন দেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছেন উপাচার্য বলে দাবি করেন শিক্ষার্থীরা। প্রতিষ্ঠার এক যুগের বেশি সময় অতিবাহিত করলেও নানা সমস্যা, সংকট এবং অপুর্ণতা যেন পিছু ছাড়ছে না বিশ্ববিদ্যালয়টির। প্রশাসনের স্বদিচ্ছা থাকলেই বাস্তবায়ন সম্ভব এমন সব দাবিও আন্দোলন করে আদায় করতে হয় বলে দাবি করেন শিক্ষার্থীরা।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি নিয়ে উপাচার্যকে স্মারকলিপি প্রদান করার পর সে সব দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন উপাচার্য। কিন্তু দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও বাস্তবায়ন দেখেনি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল স্নাতোকোত্তরে ভর্তি ফি কমানো, সমাবর্তনের আয়োজন, শিক্ষার্থী কল্যাণ তহবিল গঠন, বাস সংখ্যা বৃদ্ধি, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন’র (বিআরটিসি) ফিটনেসবিহীন বাস পরিবর্তন, সমগ্র ক্যাম্পাস ওয়াইফাই আওতাভুক্ত করা, হলের খাবারে ভর্তুকি প্রদানসহ বিভিন্ন দাবি। এসব দাবিগুলো সর্বোচ্চ বিবেচনায় বিভিন্ন মেয়াদে বাস্তবায়নের আশ্বাসের পরও মাসের পর মাস পেরিয়ে গেলেও উপাচার্যের প্রশাসন কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি বলে শিক্ষার্থীরা জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, ‘উপাচার্য আমাদের বারবার বিভিন্ন স্বপ্ন দেখালেও এখনো তা স্বপ্নেই রয়ে গেছে, বাস্তবে তেমন কিছুই দেখছিনা। উপাচার্য আসার পর থেকেই বাস বৃদ্ধি, রাস্তা সংস্কার, মাস্টার্সের ভর্তি ফি কমানোসহ বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দিলেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি।’

শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ বলেন, ‘উপাচার্যকে সীমাবদ্ধ সম্পদ দিয়েই শিক্ষার্থীদের দাবী পূরণ আরও আন্তরিক হওয়া এবং জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে। সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক কিছুই পূরণ করা সম্ভব নয়, তাই বলে কি স্বাভাবিক কার্যক্রম থেমে থাকবে?’

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক কাউন্সিলে স্নাতোকোত্তরে ভর্তি ফি কমানো নিয়ে গুরুত্বের ভিত্তিতে আলোচনার আশ্বাস দিলেও আদতে কোন আলোচনা হয়েছে কিনা এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। কারন এ বিষয়ে জানতে গেলে উপাচার্য কমিটির সাথে কথা বলতে বললে খোঁজ নিয়ে কমিটির সন্ধান মেলেনি।

উপাচার্যের কাছে কমিটির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘কমিটিতে কে আছে তাও কি উপাচার্য বলে দিবে? আর তোমরা একটু হলেই শুধু আমাকে কেন ধরো, যার সাথে যে কমিটি সম্পর্কিত তাকে জিজ্ঞেস করো।’

বিভিন্ন সময়ে বিশ^বিদ্যালয়ের সংবাদকর্মীরা তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি কোন বক্তব্য প্রদান না করে তার নিয়োগকৃত গণমাধ্যম উপাদেষ্টার সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। এ প্রতিবেদনের জন্যও তার বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাকে ফোন দিয়ে পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (চলতি দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. মো: আবু তাহের বলেন, ‘উপাচার্য মহোদয়ের আদেশে বিষয়গুলো আমরা গুরুত্বের সাথে দেখতেছি। ইতোমধ্যে স্নাতোকোত্তরে ভর্তি ফি কমানোর জন্য কমিটি করে দেওয়া হয়েছে, সমাবর্তনের জন্য ডেপুটি রেজিস্ট্রারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিসেম্বরে আশা করি আমরা সমাবর্তন করতে পারবো, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরিন রাস্তার টেন্ডার খুব শিগরই হবে এবং বাস চালক নিয়োগের কার্যক্রমও চলছে। খুব দ্রুতই আমরা সব সমস্যার সমাধান করতে পারবো।’

এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য ৬৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প ২০১৪-১৫ অর্থবছরে শুরু হয়ে বর্তমান চলমান থাকলেও তা চলছে ধীরগতিতে। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের জুন মাসে। এছাড়া নতুন করে ১ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় গত বছরের অক্টোবর মাসে। প্রকল্পটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের জীমনেসিয়াম, উন্নত মানের গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ, বিউটিপার্লার, অধ্যাধুনিক ক্লাস রুম, অডিটোরিয়ারমের স্বপ্ন দেখালেও তা শুধুমাত্র প্রচার প্রচারনাতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। গত বছরের নভেম্বর থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তার কোন সম্ভাবনাই দেখছে না শিক্ষার্থীরা। এ উন্নয়ন কর্মকান্ডে ক্যাম্পাস সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও ক্যাম্পাসকে দুই অংশে বিভক্ত করা হচ্ছে বলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনও করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব বিষয়ে কথা বললে দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং বিশিষ্ট জনেরা বিষ্ময় প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ. আ. ম. স. আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘একজন উপাচার্যের সার্বক্ষণিকই ক্যাম্পাসে থাকা উচিত, আইন অনুযায়ীই নিয়মিত সিন্ডিকেটে সভা করা উচিত। কিন্তু তিনি আমার সাবেক সহকর্মী ছিলেন, তাই তার বিষয়ে মন্তব্য করাটা আমার জন্য বিব্রতকর।’

বিডি২৪লাইভ/এজে

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: