প্রচ্ছদ / বিনোদন / বিস্তারিত

সম্পাদনা: আমিনুল ইসলাম রোমান

ডেস্ক এডিটর

যে কারণে গৃহবন্দি ছিলেন বুলবুল

২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৩:৩০:৪৮

ছবি: সংগৃহীত

ঘুম ভাঙার আগেই শোকে জেগে উঠেছে এ শহর। বাংলা সংগীত জগতের কিংবদন্তী গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই (ইন্না লিল্লাহি অইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

আজ মঙ্গলবার (২২ জানুয়ারি) ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসায় তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ছেলে সামির আহমেদ।

অনেকদিন ধরেই হার্টের অসুখে ভুগছিলেন কিংবদন্তি সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। অবশেষে হার্ট অ্যাটাকেই জীবনের অবসান ঘটলো তার। মৃত্যুর আগের কয়েকটা বছর কাটিয়েছেন তিনি গৃহবন্দি হয়ে। কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো অনেকের জানা নেই।

যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষী ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। অনেকেই যেখানে টাকা আর জীবনের হুমকিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সাক্ষী দিতে চাননি, চুপ থেকেছেন দিনের পর দিন; সেখানে বাঘের মতোই বীরত্ব দেখিয়েছেন এই গানের মানুষ।

তিনি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেছেন সত্যের কথা, ন্যায়ের পক্ষে, রাষ্ট্রের হয়ে। মৃত্যু তাকে পিছপা করতে পারেনি।

কিন্তু এই সাক্ষ্য দেয়ার বিনিময়ে অনেক চড়া মূল্যই দিতে হয়েছে তাকে। হারিয়েছেন ছোট ভাইকে। ভাইয়ের মৃত্যু তাকে হতবাক করে দিয়েছিল, হতাশও। তিনি মেনে নিতে পারেননি, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেয়া দলের শাসনামলে স্বাধীনতার বিরোধীদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেয়ার বিনিময়ে ভাই হারাতে হবে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে। রাজধানীর খিলগাঁও রেললাইনে পাওয়া গিয়েছিল বুলবুলের ভাইয়ের গলাকাটা লাশ।

ভাইয়ের শোক নিয়ে ঘর থেকেই বের হতেন না গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। নিরবে নিভৃতে কাটিয়েছেন জীবনের শেষ দিনগুলো।

এর মধ্যে আসে তারও মৃত্যুর হুমকি। এরপর থেকে সরকারি নিরাপত্তার বলয়ে বাঁধা পড়েন তিনি। শুরু হয় শারীরিক অসুস্থতা। তার হৃদযন্ত্রে ৮টি ব্লক ধরা পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

তবে সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে তিনি এখন সবার থেকে অনেক দূরে। মঙ্গলবার ভোর রাতে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি।

প্রায় ছয় বছরের গৃহবন্দি জীবন নিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলেন এই কিংবদন্তি। তার সঙ্গী বলতে ছিল একমাত্র পুত্র সামির ও একান্ত সহকারী রোজেন। গান তেমন নিয়মিত করতেন না। গানের মানুষদের সাথেও আড্ডা বা মেলামেশা কমে গিয়েছিল।

যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, গৃহবন্দি থেকে মুক্ত মনে হয় কি না জানতে চাইলে গণমাধ্যমে বুলবুল হতাশা নিয়ে বলেছলিন, ‘আমার গৃহবন্দি জীবন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এখন আর কিছু মনে হয় না। আপনি তো ভালোভাবে বোঝেন যে, হার্টের চিকিৎসার পর আবার কিন্তু এই চার দেয়ালের মধ্যেই আসতে হবে। এটা কিন্তু সমাধান না। তাই না? আপনারা হার্টটা ঠিক করে আবার এই জায়গাটায় পাঠিয়ে দেবেন, হার্টটা আবার নষ্ট হবে। আপনারা মুক্ত করে দেন।’

কিংবদন্তি এই সংগীতজ্ঞ জীবনের শেষ ফেসবুক স্ট্যাটাসে তাকে ভুলে না যাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন।

চলতি মাসের ২ই জানুয়ারি সকালে তার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নিজের একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেন, ‘আমাকে যেন ভুলে না যাও… তাই একটা ছবি পোস্ট করে মুখটা মনে করিয়ে দিলাম।’

কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক ও মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তাকে এ ভুলে না যাবার ফেসবুক স্ট্যাটাসটি শেয়ার হয়েছে ২১৭ বার এবং এতে মন্তব্য করা হয়েছে প্রায় ১২শ বার।

আর কোনোদিন কাউকে মুক্ত করে দেয়ার আকুতি জানাবেন না বুলবুল। মৃত্যু তাকে চিরমুক্তি দিয়ে দিয়েছে।

গত বছর ১৬ মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল লিখেছেন, ‘একটি ঘরে ছয় বছর গৃহবন্দী থাকতে থাকতে আমি আজ উল্লেখযোগ্যভাবে অসুস্থ। আমার হার্টে আটটা ব্লক ধরা পড়েছে। এরই মধ্যে কাউকে না জানিয়ে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে সিসিইউতে চার দিন ছিলাম। আগামী ১০ দিনের মধ্যে হার্টের বাইপাস সার্জারি করানোর জন্য প্রস্তুত আছি।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘কোনো সরকারি সাহায্য কিংবা শিল্পী, বন্ধুবান্ধবের সাহায্য আমার দরকার নাই। আমি একাই যথেষ্ট। শুধু অপারেশনের আগে ১০ সেকেন্ডের জন্য বুকের মাঝে বাংলাদেশের পতাকা আর কোরআন শরিফ রাখতে চাই।’ এর পর আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এই শিল্পীর ব্যক্তিগত সহকারী রোজেন জানান, স্যার ভোর সোয়া ৪টার দিকে বাসাতেই মারা গেছেন। তিনি নিজেই আমাকে ফোন দিয়ে জানান, ‘তাড়াতাড়ি বাসায় আস, আমার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।’ এরপর ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে আমি স্যারের বাসায় যাই। কিন্তু কোনো পালস পাইনি। পরে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা তাকে সাড়ে ৫টার দিকে মৃত ঘোষণা করেন। স্যারের সাথে কোনো কথাই বলার সুযোগ পাইনি আমি।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ চক্রবর্তী বলেন, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে সকাল সোয়া ছয়টার দিকে হাসপাতালে আনা হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা যান।

উল্লেখ্য, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের জন্ম ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায়। ১৯৭১ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বালক বুলবুল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাইফেল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানী শত্রুদের ঘায়েল করতে।

মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ স্মৃতি বিস্মৃতি নিয়ে বহু জনপ্রিয় গান লিখেছেন এবং সুর করেছেন। ‘এই দেশ আমার সুন্দরী রাজকন্যা’, ‘আয় রে মা আয় রে’, ‘উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম’, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে’, ‘ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেল লাইনের ধারে’, ‘মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেবনা’- এমন বহু কালজয়ী গানের স্রষ্টা নিভৃতচারী এই শিল্পী।

বাংলা সঙ্গীতের চিরসবুজ গান ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি, ‘আমার বাবার মুখে’,‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে’, ‘পড়েনা চোখের পলক’, ‘অনেক সাধনার পর’, ‘আমার গরুর গাড়িতে’, ‘পৃথিবীর যত সুখ’, আট আনার জীবন সহ অসংখ্য কালজয়ী বিখ্যাত গানের গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

৭০ দশক থেকেই চলচ্চিত্র এবং অডিওতে সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছেন এই গুণী সঙ্গীত পরিচালক। বিখ্যাত গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা ‘সবকটা জানালা খোলে দাওনা’, শ্রদ্ধেয় রফিকউজ্জামান এর লেখা ‘সেই রেললাইন ধারে’, সহ অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান তিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি ১৯৭১ সালের একজন মুক্তিযোদ্ধা।

চলচ্চিত্রেও তার গান ছড়িয়েছে মুগ্ধতা। তার হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছে ‘আমার সারা দেহ খেও গো মাটি’, ‘প্রেমের তাজমহল’সহ অনেক জনপ্রিয় গান।

১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবিতে সংগীত পরিচালনার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে কাজ করা শুরু করেন বুলবুল। এর পর তিনি গানের অ্যালবাম ও অসংখ্য চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন গুণী এ মানুষটি। তিনি স্বাধীনভাবে গানের অ্যালবাম তৈরি করেছেন এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন।

সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আব্দুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনকচাঁপাসহ দেশের প্রায় সব জনপ্রিয় শিল্পীদের দিয়ে কাজ করিয়েছেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়।

বিডি২৪লাইভ/এআইআর

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: