প্রচ্ছদ / ধর্ম ও জীবন / বিস্তারিত

প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হলেই দিতে হবে কুরআন তেলাওয়াত পরীক্ষা!

২২ জানুয়ারি ২০১৯ , ০৬:২৫:১৩

ছবি: ইন্টারনেট

নানান দেশে নানান রীতি। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনেও দেশ বিভেদে থাকে বিভিন্ন শর্ত। বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ নানা শর্ত পূরণ করতে হয় প্রার্থীদের। কিন্তু এমন একটি দেশ রয়েছে যেখানে কুরআন তেলাওয়াতের পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হলেই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সম্ভব। 

সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের একটি সংগঠন দেশটির প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদেরকে কুরআন তেলাওয়াতের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলো।

২০১৯ সালের এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আচেহ প্রদেশের একটি ইসলামি সংগঠন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বর্তমান প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো এবং বিরোধী দলীয় প্রার্থী প্রোবো সুবিয়ান্তোকে কুরআন তেলাওয়াতের পরীক্ষার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

কুরআন তেলাওয়াতের এ পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক সুরা ফাতিহা পাঠ। আর আয়োজকরা প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদেরকে যে কোনো একটি নির্ধারিত সুরা থেকে কিছু অংশ পাঠ করতে দেবে।

ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের এ ইসলামি সংগঠনের চেয়ারম্যান মারসিউদ্দিন ইশাক এ পরীক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের চরিত্র সামনে নিয়ে আসা এবং শরিয়াহ মতে পরিচালিত আচেহ প্রদেশের সংস্কৃতিকে জন সম্মুখে মডেল হিসেবে তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য।

এ নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের এ ইসলামি সংগঠনের চেয়ারম্যান মারসিউদ্দিন ইশাক এ পরীক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বলেন, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের চরিত্র সামনে নিয়ে আসা এবং শরিয়াহ মতে পরিচালিত আচেহ প্রদেশের সংস্কৃতিকে জন সম্মুখে মডেল হিসেবে তুলে ধরাই মূল লক্ষ্য। এর ফলে দেশের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সব নির্বাচনে অংশ নেয়া মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের কুরআনের শিক্ষা ও তেলাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করা এবং সে মতে দেশ পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ করা।

মারসিউদ্দিনের বলেন, ‘আমাদের এখানকার নেতা, যেমন গভর্নর, সংসদ সদস্য এবং অন্যান্য কাউন্সিল সদস্যদের সবাইকেই কুরআন তেলাওয়াতের পরীক্ষা দিতে হয়। পরবর্তী প্রেসিডেন্টও আমাদের নেতা হবেন। তাই আমরা কুরআন পাঠে তার সক্ষমতার বিষয়ে জানতে চাই, ঠিক যেমন আমাদের স্থানীয় নেতাদের ক্ষেত্রে হয়।’

এদিকে জাকার্তার ‘শরিফ হিদায়াতুল্লাহ স্টেট ইসলামিক ইউনিভার্সিটির’ সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. কোমারুদ্দিন হিদায়াত ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, এমন পরীক্ষা অপ্রয়োজনীয় এবং ‘ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে’ বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা।

তার ভাষ্য, ‘আমার এটা জেনে দুঃখ হয়েছে। আমাদের জীবন হওয়ার কথা সংবিধান নির্ভর। ধর্ম সম্পর্কে জানা ও বোঝা দরকার।  কিন্তু তার মানে এই নয় যে কুরআন তেলাওয়াত না করতে পারলে আমাদের জীবনই বৃথা।’

‘উচ্চশিক্ষিত হওয়া বা চাকরি পাওয়ার জন্য ধর্ম কখনওই কোনও মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি,’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছেন, ‘আমরা যখন কাউকে বৈমানিক হিসেবে নিয়োগ দেই, তখন আমরা তার বিমান চালনার সক্ষমতার পরীক্ষা নেই। তার কুরআন তেলাওয়াতের সক্ষমতার পরীক্ষা নয়।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।’ তিনি মনে করেন, কুরআন তেলাওয়াতের পরীক্ষার বদলে যদি প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রতি কতটা সহানুভূতিশীল তার পরীক্ষা নেওয়া যেত, তাহলে ভালো হতো।

অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানদের সবচেয়ে বড় সংগঠন ‘নাহদাতুল উলামার’ কর্মকর্তা ড. রুমাদি আহমাদ বলেন, প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের জন্য কুরআন তেলাওয়াত পরীক্ষার আয়োজন করার মধ্য দিয়ে ধর্মকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। তার ভাষ্য, ‘আসন্ন নির্বাচনে কুরআন তেলাওয়াতের সক্ষমতাকে কোনও ইস্যু বানানোর প্রয়োজন নেই। এটা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের স্পষ্ট উদাহরণ। বিষয়টি বিপদজনক, যা ভিন্ন ভিন্ন নৃতাত্বিক গোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষের মধ্যে ঘৃণা তৈরি করবে।’

মারসিউদ্দিন ইশাক জানান, জোকো উইদোদোর পক্ষ থেকে এই আমন্ত্রণের বিষয়ে  উত্তর পাঠানো হয়েছে। তার বিষয়টি বিবেচনার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, প্রাবো আমন্ত্রণের কোনও উত্তর পাঠাননি। প্রাবো একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা। সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর দ্বিতীয় কন্যার বিয়ে হয়েছিল তার সঙ্গে।

উল্লেখ্য, ইন্দোনেশিয়া হলো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। ল্যাটিন ইন্ডাস থেকে ইন্দোনেশিয়া শব্দটি এসেছে।  ডাচ উপনিবেশের কারণে তাদের দেয়া নামটি ওই অঞ্চলের জন্য প্রচলিত হয়। ১৯০০ সাল থেকে জায়গাটি ইন্দোনেশিয়া নামে পরিচিতি পায়। প্রায় ৫,০০০ দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত এই দেশটি পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম জাকার্তা। সরকারীভাবে ইন্দোনেশিয়ার নাম ইন্দোনেশীয় প্রজাতন্ত্রী (ইন্দোনেশীয় ভাষায় – Republik Indonesia).
দেশটিতে মানুষ বসতির ইতিহাস বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো। যাদের বলা হয় জাভাম্যান। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে তাইওয়ান থেকে একটি মানব প্রবাহের ধারা ইন্দোনেশিয়ায় যায় খ্রিষ্টজন্মের দুই হাজার বছর আগে। তারা আদিবাসীদের ধীরে ধীরে আরো পূর্ব দিকে নিয়ে যায়।

প্রথম শতাব্দীতে সভ্যতার বিস্তার ঘটে। কৃষিকেন্দ্রিক গ্রামীণ সমাজ গঠিত হয়। গড়ে ওঠে অসংখ্য শহর-নগর-বন্দর। সমুদ্র উপকূলে বিস্তার ঘটে ব্যবসা-বাণিজ্য। চীনের সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে ইন্দোনেশিয়া হয়ে। এর ফলে দেশটিতে এক দিক থেকে হিন্দু ধর্ম অন্য দিক থেকে আসে বৌদ্ধ ধর্ম। দু’টি ধর্ম জীবনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুসলিমদের আগমন ঘটে দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে। উত্তর সুমাত্রা হয়ে ক্রমে মুসলমানরা ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার মাইলের বিস্তৃত ইন্দোনেশিয়ায়। ষোড়শ শতাব্দীতে দেশটির প্রধান ধর্ম হয়ে যায় ইসলাম। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতি ক্রমেই ছাপিয়ে গিয়েছিল বৌদ্ধ আর হিন্দুপ্রধান এ অঞ্চলে। এর পর ধাপে ধাপে ইউরোপীয়দের আগমন ঘটে দেশটিতে। ব্রিটিশ আর ডাচরা তাদের সাম্রাজ্য স্থাপন করলেও ধর্ম ও সংস্কৃতিতে তারা কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি।

বিডি২৪লাইভ/এসএ
 

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: