আক্কাস আল মাহমুদ রিদয়

বুড়িচং, কুমিল্লা প্রতিনিধি

খাল ভরাট করে ঘরবাড়ী ও দোকান পাট নির্মাণ

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১৭:১৬:০০

ছবি: প্রতিনিধি

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৪৮ হাজারের বেশি কৃষক কৃষিকাজের মাধ্যমে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। অত্র অঞ্চলের প্রধান কৃষিপন্য হল ধান। ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে অনেক কৃষক তাদের পরিবারের যাবতীয় চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করে থাকে। বন্যা ও বৃষ্টির কারণে বছরের অন্যান্য ফসলের তুলনায় এ অঞ্চলেরর মানুষ বোরো ধান বেশি রোপণ করে।

কিন্ত বর্তমানে উপজেলার প্রধান প্রধান খালগুলো দীর্ঘদিন খনন না করায় পলিমাটি জমে বেশির ভাগ খাল ও নালা ভরাট হয়ে গেছে। তা ছাড়া কিছু ভূমিদস্যু ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি কেটে খালগুলো ভরাট করে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মান করেছে। ফলে দিনে দিনে পানি নিঃষ্কাশনের খাল ও নালাগুলো অস্থিত্বহীন হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় এবং উজান থেকে ভারতের পানি নেমে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়।

এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ছোট ছোট খাল ও নালাগুলোর অস্তিত্ব নেই। সড়কের কালভাট ও ব্রীজগুলো দেখতে পাওয়া যায়। ব্রীজ ও কালভাটগুলো খাল ও নালার উপর অবস্থান করার শেষ চিহ্ন হিসেবে টিকে আছে। যা দেখলে বোঝা যায় এখান দিয়ে এক সময় খাল ও নালা ছিল। যা দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও দায়িত্বশীলদের তদারকির অভাবে ক্রামন্বয়ে উপজেলার খাল ও নালাগুলো ভরাট হয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। এই খাল ও নালাগুলো প্রথম খনন করার পরে আবার কবে খনন করা হয়েছে তা কেউ বলতে পারে না। মাঝে মধ্যে খাল খননের কোন কর্মসূচি বা কোনো প্রকল্প অনুমোদন করা হলেও তা থাকে কাগজে কলমে। বাস্তবে তা কখনো আলোর মুখ দেখতে পায়নি।

বুড়িচং উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় ফসলের মাঠের নাম হলো পয়াতের জলা। যার মধ্যে বুড়িচং উপজেলা ও কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার কয়েক হাজার কৃষক ধান চাষ করে নিজেদের পরিবারে চাহিদা মেটায়। কিন্ত বিগত কয়েক দশক ধরে এই মাঠের পানি নিঃস্কাশনের জন্য চার দিকে যে খাল গুলো রয়েছে তা ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং কোথাও কোথাও ভুমিদুস্যরা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করার কারণে সামান্য বৃষ্টি হলে বোরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অত্র অঞ্চলের কৃষকের জীবনে দুর্দশা নেমে আসে। প্রতি বছর বর্ষার পানিতে ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ধান চাষ করা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা যায়, বুড়িচং উপজেলায় প্রায় দুই লাখ ৯৯ হাজার লোকের বসবাস। এর মধ্যে ৪৭ হাজার ১৮১টি পরিবারের লোকজন সরাসরি কৃষিকাজের সাথে জড়িত রয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ৯ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে এবং ৩৬ হাজার ৫৮৭ মেট্রেক টন চাল উৎপাদন হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বৃষ্টির পানি নিঃস্কাশনের জন্য যে নালা ও খাল রয়েছে সেগুলো খনন করা না হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না।

স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, বুড়িচং বাজারের সংলগ্ন পশ্চিম পাশের খালটিও ভরাট হয়ে প্রায় নালায় পরিণত হয়েছে। এটি পয়াতের জলার পানি নিঃস্কাশনের প্রধান খাল। খালটির দুপাশের বেশির ভাগ জায়গা ভরাট করে বাড়ি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। তা ছাড়া রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর পশ্চিম পাড়া এলাকায় খাল ভরাট করে সাবেক মেম্বার জজু মিয়ার ছেলে বাড়ি নির্মাণ করেছে। পূর্ণমতি বাজার সংলগ্ন খালটি মসজিদ গেইট পর্যন্ত ভরাট করে দোকান পাট নির্মাণ করেছে।

পূর্ণমতি বাগান বাড়ী হইতে কান্দারপাড় গুংগুর নদীর সাথে সংযোগ খালটির অধিকাংশ ভরা করার হয়েছে। জরইন গ্রামের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশের খালটিও ভরাট করে ফেলেছে স্থানীয় কিছু ভূমিদুস্যরা।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, উপজেলার পয়াতের জলার ধান চাষ করে তাদের খাবারের অধিকাংশ চাহিদা পুরণ করে থাকে। কিন্ত উক্ত জলার পানি নিষ্কাশনের জন্য যে খাল ও নালা রয়েছে তা ভরাট হয়ে যাওয়া সামান্য বৃষ্টিপাত হলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তাদের রোপন কৃত ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতে সারা বছর তাদের কে কষ্টে কাটে।

বুড়িচং উপজেলার ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ছোট বড় প্রায়ঃ ২০৩টি খাল রয়েছে। তার মধ্যে রাজাপুর ইউনিয়নে ১১০টি,বাকশীমূল ইউনিয়নে ৩টি, বুড়িচং সদর ইউনিয়নে ২৬টি, পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নে ৩টি, ষোলনল ইউনিয়নে ৫টি, ময়নামতি ইউনিয়নে ৯টি, ভারেল্লা উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিয়নে ১৬টি এবং মোকাম ইউনিয়নে ৩০টি খাল রয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, উপজেলায় ২০৩টি খালের তথ্য কাগজে কলমে থাকলেও বর্তমানে অধিকাংশ খালের অস্থিত্ব নেই। ২০১৮ ইং সালের ১৩ মার্চ দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় “বেশির ভাগ নালা ও খাল ভরাট বুড়িচংয়ে বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কায় ৪৭ হাজার কৃষক পরিবার” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোঃ আবুল ফজল মীর বুড়িচং উপজেলার পয়াতের জলার পানি নিঃষ্কাশনের খালগুলো পরির্দশন করে দ্রুত খননের আশ^াস প্রদান করেন।

পরবর্তীতে ২০১৮ইং সালের ৩ জুলাই কুমিল্লা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) মোঃ আসাদুজ্জামান জলাশয়ের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পানি নিঃস্কাশনের খালগুলি পরিদর্শন শেষে বুড়িচং উপজেলার পয়াত জলাশয়ের পানি নিঃস্কাশনের লক্ষে ভরাট হওয়া ও বে-দখলকৃত খালগুলি দ্রুত পুনঃখনন করা হবে বলে আশ^াস প্রদান করেন।
কিন্ত দীর্ঘ এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পরে খাল খননের ব্যবস্থা ও অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদ না করায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আবারও জলাবদ্ধতার শঙ্কায় রয়েছে স্থানীয় কৃষকরা।

সূত্রে আরও জানা যায়, বুড়িচং উপজেলা সদর ইউনিয়নের তহসিলদার মোঃ সফিকুর রহমান কিছু ভূমি দস্যুর সাথে আতাত করার ফলে সদরে বিভিন্ন খালগুলো ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণসহ ঘর-বাড়ি তৈরী করছে।

এই বিষয়ে বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরুল হাসান বলেন, উপজেলার ভরাট হওয়া খালগুলো পরিদর্শন করে প্রতিবেদন তৈরী করা হয়েছে এবং তা পানি উন্নয়ন বোর্ডে প্রেরণ করা হয়েছে। এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে খনন কাজ বাস্থবায়ন করা হবে। এডিসি রেভিনিউ নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের নেতৃত্বে প্রকল্প গ্রহন করা হবে। তবে তা সময় সাপেক্ষের ব্যাপার।

এই ব্যাপারে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোঃ আবুল ফজল মীর এর সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বিডি২৪লাইভ/এজে

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: