প্রচ্ছদ / খোলা কলাম / বিস্তারিত

কালের খেরোখাতা

৬ মে ২০১৯ , ১১:৩৭:০০

ছবি: ইন্টারনেট

ফারুক আহমদ: সম্ভবত ২০১৬ সালের মধ্যভাগে একদিন আমেরিকা থেকে লেখক-সাংবাদিক শামসাদ হুসামের ফোন পেলাম। তিনি সাংবাদিক ইসহাক কাজলের মোবাইল নাম্বারটি চান। এরই ফাঁকে এটা ওটা আলাপ হল। জানালেন সিলেটের ওপর একটি বই লিখছেন। শুনে ভাল লাগলো। এর আগে সেই ঊনিশশ’ আশির দশকের প্রথম দিকে সাপ্তাহিক যুগভেরী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত লেখা ভ্রমণকাহিনী ‘প্রচ্ছায়া পথে পথে’র মাধ্যমে তার লেখার সঙ্গে আমার পরিচয়। ভ্রমণকাহিনীটি কেমন হয়েছিল তা এখন আর মনে নেই। তখন মুসলিম সাহিত্য সংসদে কোনো কোনো সময় দেখা হত। কিন্তু আলাপ-পরিচয়ের মাধ্যমে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল বলে মনে হয় না। বিলাত আসার পরে, তার দ্বিতীয় গ্রন্থ (যৌভভাবে লিখিত) ‘কালের ক্যানভানে যারা’ পড়ার সৌভাগ্য হয়। গ্রন্থটি ভালো লেগেছিল, এবং সেটি এখনো আমার সংগ্রহে আছে। বলা বাহুল্য, আমি আজীবন সিলেটের ইতিহাসের একজন ছাত্র। সিলেটবিষয়ক কোনো লেখা পেলেই তা সংগ্রহে রাখি, পড়ি, এবং নোট নিই। যখন জানলাম তিনি সিলেটের আঞ্চলিক ইতিহাসবিষয়ক বই লিখছেন, তখন থেকেই অধীর আগ্রহে ছিলাম বইটি পড়ার জন্য। সে সুযোগটি করে দেন লন্ডনবাসী কবি ও কলামিস্ট রেণু লুৎফা। আমেরিকা থেকে তিনি ইসহাক কাজলের জন্য শামসাদ হুসামের দেয়া আলোচ্য বইটি নিয়ে আসেন। শুনে বইটি পড়ার জন্য ধার করতে গেলে ইসহাক কাজল শর্তজুড়ে দিলেন যে, ‘এতো দূর থেকে লেখক বইটি পাঠিয়েছেন, তাই এর একটি রিভিউ করা দরকার’। অভ্যাসমতো বইটি নিয়ে এসে সেই রাতেই চারশ’ ঊনচল্লিশ পৃষ্ঠার দৃষ্টিনন্দন এ বইটি পড়তে শুরু করি। প্রথমেই চোখ থেমে যায় নামকরণের ওপর। ক্ষুদ্রজ্ঞানে বইয়ের নামের অর্থটাই উদ্ধার করতে পারছিলাম না। ফোন করলাম কবি হামিদ মোহাম্মদকে, তারপর ইসহাক কাজল, এবং সবশেষে রেণু লুৎফাকে। কিন্তু কেউই সঠিক উত্তর দিতে পারলেন না। তারপর উৎসর্গপত্র পড়তে গিয়ে আবারও থামতে হলো। উৎসর্গ করা হয়েছে, “মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী এবং বাংলার সক্রেটিস একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. জি সি দেবকে”। এই পর্যন্ত পড়ে যে প্রশ্নটি মনে জেগেছিল, তা হল – জেনারেল ওসমানী কি ‘মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক’ ছিলেন? নাকি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান? কারণ, সে সময়ে ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাকে ‘সিএনসি’ বলা হয়েছে। যদিও তখন যারা মুজিবনগর সরকারে কাজ করতেন তারা ভুলক্রমে অনেক সময় মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নামের আগে, ‘মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক’ শব্দটিও ব্যবহার করেছেন। এমনকী মুজিবনগর সরকারের কর্মকর্তাগণও তখন দেশের নাম, ‘বাংলা দেশ’ এভাবে লিখেছেন ও লিখতেন। এ ধরণের আরও অনেক উদাহরণ আছে। বিশেষ করে দেশের নাম, ‘বাংলা দেশ’ লেখা দেখে আমাদের বিলাতবাসী এক সিলেটী, আরও খোলাসা করে বললে, গোলাপগঞ্জের তাসাদ্দুক আহমদ তখন মুজিবনগর সরকারকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন দেশের নামটি একশব্দে ‘বাংলাদেশ’ হওয়ার উচিৎ। যুক্তি দেখিয়েছিলেন – ইংল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, দয়েচল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নাম একশব্দে। মুজিবনগর সরকার তার এই যুক্তিটি গ্রহণ করে, এবং ‘বাংলা দেশের’ নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। পরে মুজিবনগর সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা লিখিতভাবে তাকে জানায়। এই চিঠি পাওয়ার পরে তাসাদ্দুক আহমদ লন্ডনের টাইম্স পত্রিকাকে মুজিবনগর সরকারের চিঠির ফ্যাক্সিমিলিসহ সিদ্ধান্তটির কথা লিখিতভাবে জানানোর পর থেকেই ব্রিটিশ কাগজপত্রে ‘বাংলা দেশ’ নামটি একশব্দে ‘বাংলাদেশ’ লেখা শুরু হয়।[1] একইভাবে এম এ জি ওসমানী ছিলেন প্রধান সেনাপতি। তার নামের আগে ‘সর্বাধিনায়ক’ শব্দটির ব্যবহারটিও ছিল ভুল। কারণ, রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া অন্য কারো পক্ষে এ শব্দটি ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। তখন যারা শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন, তাদের এতো চিন্তা-ভাবনা করে শব্দ চয়নের মাধ্যমে পদটি ব্যবহারের সুযোগ ও সময় কোনোটাই ছিল না। বর্তমানে তাদের দোহাই দিয়ে শব্দটিকে বেদবাক্য হিসেবে গ্রহণ করারও কোনো সুযোগ নেই। ভুল শব্দ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ব্যবহার করলেও তা ভুল। একজন ইতিহাস লেখকের কাছে এ ধরণের ভুল কি আশা করা যায়?

চারটি অধ্যায়ে, অর্থাৎ পরিচ্ছেদে বিভক্ত বইটির প্রত্যেকটি পরিচ্ছেদকে আরও তেরো থেকে ঊনিশটি উপ-পরিচ্ছেদে ভাগ করে এক একটি বিষয় নিয়ে লেখক ইতিহাস তুলে ধরেছেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, প্রত্যেকটি পরিচ্ছেদ পড়তে গিয়ে আমাকে শব্দ, বাক্য ও ভাষার সঙ্গে অনেকটা সংগ্রাম করে এগুতে হয়েছে। উদারণ হিসেবে প্রথম পরিচ্ছেদটির কথাই ধরা যাক। এটি শুরু হয়েছে, ‘সিলেট: প্রকৃতি ও পরিবেশ’ উপশিরোনাম দিয়ে। এই পরিচ্ছেদে সিলেটের সীমা, হযরত শাহজালালের সিলেট আগমন, ইউ অ্যান সাঙ-এর ভ্রমণকাহিনী, পলাশীর যুদ্ধ, ইত্যাদি ইত্যাদি স্থান পেয়েছে। আভিধানিক অর্থে প্রকৃতি হচ্ছে স্বভাব; চরিত্র, আচার-আচরণ; বাহিরের জগৎ; নিসর্গ ইত্যাদি। ‘পরিবেশ’ হচ্ছে চার পাশের অবস্থা। প্রশ্ন হচ্ছে এগুলো কি প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কিত বিষয়? তাহলে এর পরে আলাদাভাবে, ‘সিলেটের দুটি জলপ্রপাত’ শিরোনাম দিয়ে মাধবকুন্ড ও হামহামের আলোচনা কেন? এই একই অধ্যায়ে সিলেট জেলার নামকরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “কথিত আছে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে হযরত শাহজালাল (রা.) যখন সিলেট বিজয়ে আসেন তখন সিলেটের রাজা গৌড় গোবিন্দ এই মহান দরবেশের আগমনে বাধা দেয়া উদ্দেশ্যে তার প্রবেশ পথের মুখে সুবৃহৎ একটি পাথর পুঁতে রেখেছিলেন। তখন হযরত শাহজালাল (রা.) সেই পাথরের ওপর তার হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করে বলেছিলেন ‘শিল তুম হট যাও’ সেই শিল হট যাও থেকেই সিলট বা সিলেট নামের উৎপত্তি।”

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, ‘শিল তুম হট যাও’ এগুলো কোন ভাষার শব্দ? হযরত শাহজালাল যখন ভারতে প্রবেশ করে বিভিন্ন প্রদেশের মধ্য দিয়ে সিলেটে আসেন, তখন হিন্দি অথবা উর্দু ভাষাতো সকল প্রদেশের ভাষা ছিল না, এখনো নয়। এমনকী শাসকশ্রেণির ভাষাও ছিল না। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে সিলেট কী কোনো দুর্গ অথবা গুহা যে, এর প্রবেশ পথের মুখ থাকবে? তর্কে না গিয়ে যদি ধরে নিই যে, সিলেট একটি দুর্গ অথবা গুহাই ছিল, এবং সে দুর্গ অথবা গুহার প্রবেশ মুখও ছিল। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে যে, এই প্রবেশমুখটি কোথায় ছিল; এবং যে বিশাল পাথরটি এই দুর্গের প্রবেশমুখে পুঁতে রাখা হয়েছিল পরবর্তীকালে সেটির কী দশা হয়েছিল? নাকি সেটি এখনো কোথায়ও আছে? এই কথাগুলো কী ইতিহাসের পর্যায়ে পড়ে? তৃতীয় প্রশ্ন হযরত শাহ জালাল কি নবী বা রসুল যে তার নামের সঙ্গে রাদিয়াল্লাহু আনহু (রা.) লেখা হবে? ধরে নিলাম এটা মুদ্রণ প্রমাদ।

প্রায় সাড়ে চারশ পৃষ্ঠার এই বিরাট বইটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে কম। করলে হয়তো আরেকটি বই হয়ে যাবে। আমি শুধু প্রথম অধ্যায়ের কয়েকটি তথ্য সম্পর্কে আলোচনা করেই লেখাটির ইতি টানবো। ‘সিলেট: প্রকৃতি ও পরিবেশ’ অধ্যায়ে শামসাদ হুসাম আরও লিখেছেন, “১৭৭২ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে একজন ব্রিটিশ ‘রবার্ট লিন্ডসে’ সামান্য রাইটার হিসেবে প্রথমে কলকাতায় এলেও পরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি সিলেটের শাসনকর্তার দায়িত্ব নিয়ে সিলেটে আসেন (পৃ.-১০)।” এ তথ্যটি সঠিক নয়। ১৭৭২ সালে রবার্ট লিন্ডজি সিলেটের কালেক্টর হয়ে আসেননি, এসেছিলেন উইলিয়াম মেইকপিস থেকারে। লিন্ডজি (পরবর্তীকালে লর্ড লিন্ডজি) কালেক্টর হয়ে আসেন, ১৭৭৭ সালের অক্টোবর মাসে।[2] এছাড়া ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগ’ এবং ‘চেষ্টা-তদবীর’ এর মধ্যে তফাতের কথা না হয় বাদই দিলাম।

এর পরে লিখেছেন, “ঐতিহাসিক তথ্যমতে – ১৮৭৮ সালে সিলেট পৌরসভা স্থাপিত হয়েছিল। এই পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন রায়বাহাদুর দুলালচন্দ্র দেব। ১৮৮৩ সালে নির্বাচন প্রথা চালু হলে তিনি প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৮৮৩ থেকে ১৮৮৬ সাল পর্যন্ত। ডেপুটি কমিশনার তখন পদাধিকার বলে চেয়ারম্যান হতেন (পৃ.-১২)।”

লেখক তার এই তথ্যটির সমর্থনে কোনো সূত্রের উল্লেখ করেননি। তবে পড়লে বুঝা যায় তথ্যটি তিনি গিয়াসউদ্দির আউয়াল সম্পাদিত ‘সিলেট পৌর পরিক্রমা’ গ্রন্থ থেকে শ্রীঅচ্যুতচরণ চৌধুরীর মতের ভিত্তিতে, সম্পাদকের লেখা প্রবন্ধ থেকে নিয়েছেন। আসলে শ্রীঅচ্যুতচরণ চৌধুরী, কিংবা গিয়াসউদ্দিন আউয়ালে দেয়া এই তথ্যটিও সঠিক নয়।[3] সঠিক তথ্য হচ্ছে, ’সিলেট পৌরসভা স্থাপিত হয় ১৮৬৮ সালে।[4] তখন থেকে ১৮৮২ সাল পর্যন্ত দুলালচন্দ্র দেব এটির সদস্য ছিলেন। ১৮৮৩ সালে স্থানীয় জনগণের মধ্য থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে চেয়ারম্যান ছাড়া অন্যান্য পদগুলো পূরণের নিয়ম চালু হলে পরে তিনি পৌরসভার নির্বাচিত প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান হবার গৌরব অর্জন করেন। এর পরে ১৮৮৭ সাল দেশীয় জনগণের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবার নিয়ম চালু হলে পরে, দুলালচন্দ্র দেব ভাইস চেয়ারম্যান থেকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত একাধারে দীর্ঘ নয় বছর দায়িত্ব পালন করেন। এর পরে দ্বিতীয় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন বৈকুণ্ঠ নাথ চক্রবর্তী। তিনি ১৮৯৭-১৯০৬ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু শামসাদ হুসাম লিখেছেন, ‘বৈকুণ্ঠ নাথ চক্রবর্তী ১৮৯৭-১৯০৩ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান ছিলেন (পৃ.-১৩)।’ এছাড়া, ‘কুমার গোপিকারমন রায়’কে লিখেছেন ‘গোপিকা রঞ্জন রায়’। এভাবে, পুরো অধ্যায়টিতে রয়েছে নামবিভ্রাট ও তথ্যবিভ্রান্তির ছড়াছড়ি। অর্থাৎ তথ্যগুলো ‘সিলেট পৌর পরিক্রমা’ থেকে নিলেও সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারেননি। তার পরের অধ্যায়গুলোতে রয়েছে প্রথম অধ্যায়ের অনেকগুলো বিষয়ের পুনরাবৃত্তি।

এবার আসা যাক, দ্বিতীয় অধ্যায়ের ‘সিলেটের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব’ বিষয়ে। এখানেও প্রশ্ন হচ্ছে, শিরোনামটি ‘সিলেটের বরেণ্য ব্যক্তিগণ’ নাকি ‘ব্যক্তিত্ব’ হবে? কারণ, ব্যক্তিত্ব হচ্ছে ব্যক্তিবিশেষের বৈশিষ্ট্য বা স্বপ্রাধান্য; শব্দটির ইংরেজি করলে হবে ‘পার্সন্যালিটি’। এই শিরোনামে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তোলে ধরা হয়েছে। পরিচিতিগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে শুধু দু’একটি উদাহরণ দিতে চাই। এ অধ্যায়ে নজমুল ইসলাম চৌধুরী’র পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে শামসাদ হুসাম লিখেছেন, “বিয়ানীবাজার উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের প্রখ্যাত জমিদার পরিবারে ১৮৮৬ সালে তার জন্ম।…১৯২৩ সালে প্রথম নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসাম প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হলেও তিনি একাধিকবারই নির্বাচনে অংশ নিয়ে এমএলএ হয়েছেন (পৃষ্ঠা-১১৫)।”

এখানে প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, নজমুল ইসলাম চৌধুরী যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন বিয়ানীবাজার কি উপজেলা ছিল? দ্বিতীয় প্রশ্ন, ১৯২৩ সালে কি আসাম প্রাদেশিক পরিষদের প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল? নাকি তিনি ১৯২৩ সালে প্রথমবারের মতো তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন? কারণ, ইতিহাস বলছে প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯২১ সালে। এর পরের প্রশ্ন হচ্ছে, ‘নজমুল ইসলাম চৌধুরী’ একাধিকবার কোন কোন সালে নির্বাচিত হয়েছিলেন? এ প্রশ্নগুলো করার কারণ, লেখক শামসাদ হুসাম, এবং তার উল্লিখিত ‘নজমুল ইসলাম চৌধুরী’র জন্ম একই গ্রামে, এবং সম্ভবত একই বংশে। অথচ ইতিহাস বলছে, ‘নজমুল ইসলাম চৌধুরী’ নামের বিয়ানী বাজার উপজেলার কেউ কোনো কালে আসাম প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ছিলেন না। আসাম প্রাদেশিক পরিষদে যিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন তার নাম – নজমুল হক চৌধুরী, বাড়ি বর্তমান বিয়ানীবাজার উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে। তিনি ১৯২৩ সালে করিমগঞ্জ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এভাবে এই অধ্যায়ে বসন্ত কুমার দাসকে লেখা হয়েছে ‘বসন্তু কুমার দাস’। মুনাওওর আলীকে ‘মনোওর আলী’। ১১০ পৃষ্ঠায় ‘দেওয়ান আহবাব চৌধুরীকে’ লেখা হয়েছে ‘দেওয়ান আহসান চৌধুরী’। ধরে নিলাম এগুলোর মুদ্রণজনীত ত্রুটি। কিন্তু নজমূল হক চৌধুরীকে ‘নজমুল ইসলাম চৌধুরী’ নামে চালান দেয়াকেও কী আমরা মুদ্রণপ্রমাদ হিসেবে মেনে নেবো? এ ধরণের ত্রুটি পুরো বইটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আবার একই অধ্যায়ে এক এক জনের পরিচিতি এসেছে একাধিকবার; কখনো আবেগের তাড়নায়, কখনো অপ্রসঙ্গিকভাবে। উদাহরণ হচ্ছে – ড. জি সি দেবের পরিচিতি এসেছে ১১৬ ও ১৩০ পৃষ্ঠায়; আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ১০০ ও ১১৭ পৃষ্ঠায়, এবং সাইফুর রহমানের ৯৯ ও ১২০ পৃষ্ঠায়। আবার অন্যান্য অধ্যায়েও এসেছে।

পরিশেষে বইটির নামকরণের বিষয়টি বাদ দিয়েও বলা যায়, গ্রন্থটিতে যেমন রয়েছে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি, ভুল বানানের ছড়াছড়ি, দুর্বল ও দুর্বোধ্য শব্দপ্রয়োগ, এবং যতি চিহ্ন ব্যবহারের দুর্বলতা, তেমনি রয়েছে আবেগের বাহুল্য। মোটকথা, বইটি যেমন গোছালো নয়, তেমনি ভালোভাবে সম্পাদিতও নয়। আমি আগেই বলেছি তার লেখা দু’একটি বই আমি পড়েছি, এবং সেগুলো ভালো লেগেছে। কিন্তু ‘সিলট: নিবাস বাংলাদেশ’ বইটি পড়ে মনে হয়েছে এটি তার লেখক সত্ত্বাকে কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে । কারণ, ইতিহাস হচ্ছে যখন যা ঘটেছিল, তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তারই বস্তুনিষ্ঠ যুক্তিনির্ভর নির্মোহ আলোচনা। এখানে অবশ্যই লেখক তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার অবজারভেশন দেবেন, কিন্তু আরোপ করবেন না। এ গ্রন্থে প্রচুর তথ্যের যোগান আছে। লেখক কিছুটা সতর্কতা অবলম্ভন করে, অভিজ্ঞ কোনো সম্পাদক দিয়ে সম্পাদনা করিয়ে নিলে অথবা ভালো কোনো প্রকাশনা সংস্থা থেকে বইটি বের করলে, এটির কলেবর যেমন দুই থেকে আড়াইশ পৃষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো, তেমনি একটি মূল্যবান তথ্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হতো। আশাকরি, ভবিষ্যতে যদি কখনো এটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় তাহলে লেখক এ কাজটি করবেন। বইটি প্রকাশক: সি এম তোফায়েল সামি, জেদ এ জুয়েল চৌধুরী এবং ডাক্তার জিয়া উদ্দিন আহমেদ। প্রকাশ কাল ২০১৭ইং। প্রচ্ছদ এঁকেছেন: মোস্তাফিজ কারিগর। সার্বিক তত্ত্বাবধানে উৎস প্রকাশনের মোস্তফা সেলিম। মূল্য রাখা হয়েছে – বাংলাদেশে: ৫২০টাকা। ইউএসএ: ২৫ ডলার। এবং ইউকে: ২০ পাউন্ড। আগ্রহী পাঠক বইটি পড়ে দেখতে পারেন, তবে তথ্য ব্যবহারে অবশ্যই বিশেষভাবে সতর্কতা অবলম্ভন করতে হবে।

বিডি২৪লাইভ/এআইআর

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: