চলন্ত বাসে গণধর্ষণ

গাজীপুর থেকেই টার্গেট করা হয় নার্স তানিয়াকে

১৬ মে, ২০১৯ ১২:০০:০০

ছবি: সংগৃহীত

চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া হত্যার ঘটনায় এবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে স্বর্ণলতা পরিবহনের কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো: রফিকুল ইসলাম রফিক (৩০)।

স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় পৌঁছার পর যাত্রীদের টিকিট পরীক্ষা করা হয়। এক এক করে সব যাত্রীর টিকিট পরীক্ষায় দেখা যায়, বাসটির শেষ গন্তব্য পিরিজপুরের একমাত্র যাত্রী নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়া। তখনই বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু তানিয়াকে টার্গেট করে। এ কাজে সহযোগিতার জন্য মেয়ে পটানোতে পারদর্শী খালাতো ভাই বোরহানকে নূরু ফোনে বীর উজুলী থেকে বাসে ওঠার কথা বলে। সে অনুযায়ী বোরহান বীর উজুলী থেকে বাসটিতে ওঠে। কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছার পর থেকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠে নূরু, বোরহান ও লালন। বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু এবং তার সহযোগী লালন মিয়ার আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে বিষয়টি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা নিশ্চিত হয়েছেন।

বুধবার (১৫ মে) বিকালে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আল-মামুন আসামি মো. রফিকুল ইসলাম রফিক এর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন।

জবানবন্দি রেকর্ড শেষে সন্ধ্যায় কাউন্টার মাস্টার মো: রফিকুল ইসলাম রফিককে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাজিতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সারোয়ার জাহান ১৬৪ ধারায় কাউন্টার মাস্টার রফিকুল ইসলাম রফিকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এ নিয়ে রিমান্ডে নেয়া পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজন ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এর আগে গত ১১ই মে মামলার প্রধান আসামি স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু এবং মঙ্গলবার (১৪ই মে) হেলপার লালন মিয়া আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া বাকি দুই আসামি লাইনম্যান মো. খোকন মিয়া (৩৮) এবং পিরিজপুরের কাউন্টার মাস্টার মো. বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংড়া বকুল (৫০) কে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বুধবার (১৫ মে) আদালতে সোপর্দ করা হলে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। গত ৮ই মে আদালত গ্রেপ্তার হওয়া এই পাঁচ আসামির প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৮দিন করে রিমান্ড মঞ্জুরের পর ওইদিন তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়েছিল।

তাদের মধ্যে বাসের চালক মো. নূরুজ্জামান নূরু গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার টোক নয়নবাজার ইউনিয়নের সালুয়াটেকি গ্রামের মৃত গিয়াস উদ্দিনের ছেলে, হেলপার মো. লালন মিয়া একই ইউনিয়নের বীর উজুলি গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদের ছেলে, কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম রফিক একই উপজেলার বাড়িসাবর ইউনিয়নের লোহাদি গ্রামের নজর আলীর ছেলে, লাইনম্যান মো. খোকন মিয়া কটিয়াদী উপজেলার ভোগপাড়া এলাকার দুলাল মিয়ার ছেলে এবং পিরিজপুরের কাউন্টার মাস্টার মো. বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংড়া বকুল বাজিতপুর উপজেলার পিরিজপুর ইউনিয়নের নিলখী মৃত আব্দুস শাহিদ ভূইয়ার ছেলে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাসের কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম রফিক আদালতে দেয়া তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তানিয়া হত্যায় নিজের সম্পৃক্ত থাকার কথা ও গুরুতর আহত হওয়ার পর দুই ঘণ্টারও বেশি সময় চিকিৎসা না পেয়ে তানিয়ার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে।

রফিক জানায়, বাসে মুমূর্ষ তানিয়াকে নিয়ে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া হাসপাতালে যাওয়ার পথে কটিয়াদীর ভোগপাড়া থেকে রফিক বাসটিতে ওঠে। তখন বাসটিতে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু, হেলপার লালন মিয়া, বোরহান ও সুপারভাইজার আলআমিনকে পায় রফিক। তখনো মেয়েটির শ্বাসপ্রশ্বাস চলছিল। চালক নূরুজ্জামান নূরু বাস চালিয়ে কাপাসিয়ার দিকে যাওয়ার সময় কটিয়াদী উপজেলার বেতাল যাওয়ার পর সুপারভাইজার আলামিন চালক নূরুকে জানায়, স্বর্ণলতা বাসের এমডি পাভেল তানিয়াকে কটিয়াদী হাসপাতালে রেখে যেতে বলেছেন। সেখান থেকে বাস কটিয়াদীর দিকে আসলে তানিয়াকে হাসপাতালে পাঠাতে দেরি হয়। রাত পৌনে ১১টার দিকে রফিকুল ইসলাম রফিক ও আল আমিন তানিয়াকে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। কিন্তু তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গত ৬ই মে রাতে তানিয়া হত্যাকাণ্ডের পরদিন ৭ই মে রাতে নিহত শাহিনুর আক্তার তানিয়ার পিতা মো. গিয়াস উদ্দিন বাদী হয়ে বাসের চালক নূরুজ্জামান নূরু, হেলপার লালন মিয়া, হাসপাতালে তানিয়ার মরদেহ আনয়নকারী আল আমিন এবং পিরিজপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মামুন এই চারজনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা বেশ কয়েকজনকে আসামি করে বাজিতপুর থানায় ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন।

মামলার এজাহারভূক্ত চার আসামির মধ্যে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু ও হেলপার মো. লালন মিয়া এই দু’জন ছাড়াও সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম রফিক, লাইনম্যান মো. খোকন মিয়া ও পিরিজপুর কাউন্টার মাস্টার মো. বকুল মিয়া ওরফে ল্যাংড়া বকুলকে ঘটনার রাতেই গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গত ৮ই মে আদালত গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ আসামির প্রত্যেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৮দিন করে রিমান্ড মঞ্জুরের পর ওইদিন তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়। তাদের মধ্যে বাসচালক নূরুজ্জামান নূরু, বাসের হেলপার লালন মিয়া ও কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার রফিকুল ইসলাম রফিক আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

নিহত শাহিনুর আক্তার তানিয়া কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে। তিনি ঢাকার ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কল্যাণপুর শাখায় সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মস্থল ঢাকা থেকে বাড়িতে আসার জন্য গত ৬ই মে বিকালে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণলতা পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) ওঠে বাড়ির নিকটতম এলাকা বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় জামতলীতে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের শিকার হন। গণধর্ষণ শেষে তাকে বাস থেকে ফেলে হত্যা করা হয়।

বিডি২৪লাইভ/টিএএফ

বিডি টুয়েন্টিফোর লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মতামত: