শিশু ও নারী নির্যাতন

বাড়ছে আত্মহত্যা, নেপথ্যে কি?

প্রকাশিত: ০৫:৫৮ অপরাহ্ণ, ১৯ মে ২০১৯

ছবি: প্রতিনিধি

রাজশাহীতে বাড়ছে সহিংস আত্মহত্যার ঘটনা। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয়, পারিবারিক কলহের জের ধরে এসব ঘটনা ঘটছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। বিশেষ করে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের মত ঘটনায় অকালে ঝরে যাচ্ছে মেধাবী শিক্ষার্থীর প্রাণ। গত সপ্তাহে কয়েকটি ধর্ষণ ও আত্মহত্যার মত প্রাণঘাতির ঘটনা মানুষের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। তুচ্ছ ঘটনায় নির্মমতার দৃশ্য ভাসছে রাজশাহীবাসীর চোখে। কিছু ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও রয়েছে অভিযোগ।

বর্তমান সময়ে পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে রাজশাহীতে নারী-শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানির মতো ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

আলোচিত কয়েকটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে মোহনপটুর উপজেলা সদরের আব্দুল মান্নান চাদের মেয়ে ৯ম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আকতার বর্ষার (১৪) আত্মহত্যা, গোদাগাড়ীর স্কুল ছাত্র জসিম উদ্দিনের (১৫) ঘটনা ও তুচ্ছ ঘটনায় প্রতিবেশির লাঠির আঘাতে আরিয়ানের মৃত্যু।

এ ছাড়াও সপ্তাহব্যাপী ঘটে কিছু ধর্ষণ চেষ্টা ঘটনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে রাজশাহীতে। এর মধ্যে বাগমারায় মঙ্গলবার ৭ বছরের শিশু ধর্ষণ চেষ্টা, বাগমারায় ইউপি চেয়ারম্যান কর্তৃক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি বেশ আলোচিত।

তাছাড়া গত রোববার পুঠিয়ায় নারীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, বুধবার বাঘায় শিক্ষার্থী ধর্ষণের চেষ্টা, একইদিন মায়ের উপর অভিযান করে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ছিল সপ্তাহজুড়ে আলোচিত।

বিশেষ করে বৃহস্পতিবার একই সাথে দুটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে মোহনপুরে চিরকুট লিখে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা ও গোদাগাড়ীতে অপমানের জালা সইতে না পেরে কিশোরের আত্মহত্যা।

উপরে বর্ণিত প্রতিটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে কোনো না কোনো সামাজিক অবক্ষয়ে প্রশাসনের অবহেলা চোখে পড়ে বলে দাবি স্থানীয়দের।

গত ২৩ এপ্রিল প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার সময় মোহনপুরে প্রতিবেশী শরিফুল ইসলামের মেয়ে বান্ধবী (ক্লাসমেট) সোনিয়ার সহযোগিতায় স্কুল ছাত্রী বর্ষাকে মুখে রুমাল চেপে অপহরণ করা হয়। অপহণের পর ওই স্কুল ছাত্রীকে একটি খালের মধ্যে নিয়ে কয়েকজন ধর্ষণ করে। পরের দিন সকালে খানপুর বাগবাজার এলাকার লোকজন অচেতন অবস্থায় ওই ছাত্রীকে পড়ে থাকতে দেখে লোকজন তার পরিবারকে খবর দেয়ার পরে পরিবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে তার উপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছে।

এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর বাবা মোহনপুর থানায় মামলা করতে গেলে থানার পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও পরে মামলা নেয়া হয়। আটক করা হয়েছে এর সাথে জড়িতদের। কিন্তু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে বৃহস্পতিবার লোকলজ্জার ভয়ে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করে বর্ষা। বর্ষার আত্মহত্যা প্রতিবাদ সরুপ ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

শুধু তাই নয়, বর্ষা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে বাঁচার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাকে বাঁচতে দেয়নি সমাজের কিছু মানুষ!

বর্ষা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর লোকলজ্জায় বাইরে বের হতো না। তারপরও ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হওয়ার কারণে আসামি পক্ষের লোকজন অব্যাহত হুমকি, অকথ্য ভাষায় বর্ষার পরিবারকে গালাগালি। সব মিলিয়ে বর্ষা হয়ে উঠে পরিবারের সমস্যার প্রধান কারণ। তিনি আত্মহত্যা করেছেন? কিন্তু বাঁচিয়ে দিয়ে গেছেন তার পরিবারকে।

কিন্তু তার মৃত্যু ও কলঙ্কের দায়ভার কার?

বর্ষার পরিবারের লোকজন জানান, পরিবারে একজন মেয়ে ধর্ষিত হলে সমাজে মাথা উঁচু করে চলা যায় না। উঠতে বসতে খোটা খেতে হয় প্রতিবেশিদের কাছে। বর্ষা ধর্ষিত হওয়ার পর একঘোরে পরিবারের মত বাস করেছেন তার পরিবারের লোকজন। কিন্তু বর্ষা আত্মহত্যা করে বাঁচিয়ে দিয়েছে পরিবারটিকে। আসামি পক্ষ সমাজের অপমান গ্লানি সহ্য করতে না পেরে খাতায় ‘সুইসাইড নোট’ লিখে আত্মহত্যা করেন তিনি।

এ দিকে, সমাজিক কালচার বা প্রথা থেকে আজো মানুষ বের হতে পারেনি। সমাজিক পরিবর্তন পরিবতন, ন্যায় বিচারসহ পরিবর্তন হয়েছে আইনের। কিন্তু এখনো গ্রাম্য সালিশ প্রথা মানুষের জীবন যাপনের কাল হয়ে আছে। সমাজ প্রতিদের হুটহাট কিছু নিয়মের কারণে আজ মানুষ সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে সেই বর্বর যুগের মতই। আইনে গ্রাম্য সালিশে ৩ শ টাকার উপর জরিমানা করার বিধান নেই। আর শারীরিক বা মানুষিক নির্যাতনের এখনো কোনো আইন পাস হয়নি।

কিন্তু এখনও গ্রাম্য সালিশে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। একই সাথে শারীরিক নির্যাতনের বিধান এখনো প্রচলিত।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সমাজপতিদের এমনি খেয়াল খুশির বলি হলো কিশোর জসিম উদ্দিন। গ্রাম্য সালিশে জুতাপেটার অপমান সইতে না পেরে সে আত্মহত্যার মত পথ বেছে নেয়। জসিম উদ্দিন মাটিকাটা ইউনিয়নের শাহাব্দিপুর গ্রামের মজিবুর রহমানের ছেলে। সে পিরিজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সরমংলা আমতলা এলাকা থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সমাজ আধুনিক যুগে এসেও সমাজ পতিরা সেই বর্বর যুগের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। যার কারণে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে কিশোর-কিশোরীরা।

অপরদিকে এসব মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে একেবারে নিশ্চুপ সমাজের বিবেক মানবাধিকার সংস্থাগুলো!

সভা সেমিনারে এসব মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে গলা ফাটিয়ে ধর্ষণ হত্যার বিরুদ্ধে কথা বলতে শোনা যায়। কিন্তু এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের জন্য মাঠে দেখা যায় না। দুই-একদিন মাঠে দেখা গেলেও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে তারা ব্যস্ত এমনটাই মনে করছেন সমাজের সচেতন মহল।

এ দিকে অপহরণের পর আসামির স্বজনের হুমকি আর অপমানে রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার স্কুলছাত্রী সুমাইয়া আকতার বর্ষা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

বর্ষার আত্মহত্যার ঘটনায় ১৩ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন তার বাবা। পুলিশ এ মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আসামি মুকুল কারাগারে থাকলেও অন্য আসামিরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। আসামি সোনিয়া আদালত থেকে জামিন নিয়ে পরিবারসহ পালিয়েছে। শনিবার দুপুরে তাদের বাড়ি গেলে তালা ঝুলতে দেখা যায়।

বিডি২৪লাইভ/এইচকে

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: