প্রচ্ছদ / ক্যাম্পাস / বিস্তারিত

আন্দোলন ঠেকাতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ভিন্ন কৌশল

২১ মে ২০১৯ , ১০:০২:০০

ছবি: প্রতিনিধি

গণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নির্দেশনায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ডাঃ লায়লা পারভীন বানুর নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এপ্রিল মাসের বেতন আটকে রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। চলতি মাসের ২১ তারিখ অতিবাহিত হলেও গত এপ্রিল মাসের বেতন পায়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় চার শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তা।

এতে রমজান মাসে দুর্মূল্যের বাজারে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে অনেক শিক্ষক কর্মকর্তা, কর্মচারীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে বৈধ উপাচার্যের দাবিতে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন আটকে রাখা হয়েছে। যদিও এই আন্দোলনের সাথে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ন্যূনতম কোন সম্পর্ক নেই বলেও জানা যায়। ক্লাস, পরীক্ষা বর্জন করে গত ৬ এপ্রিল আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক এবং প্রশাসনিক ভবনের সকল শিক্ষক-কর্মকর্তা তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে উপস্থিত রয়েছেন। তাদের সাথে কথা বলতে গেলে চাকরি হারানোর ভয়ে অধিকাংশই কথা বলতে রাজি হননি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সকল শিক্ষক-কর্মকর্তার বেতন বন্ধ করে দেওয়াকে হঠকারী, অযৌক্তিক, অনাকাঙ্খিত এবং নিপীড়নমূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মকর্তাগণ।

আর যারা কথা বলেছেন তারা সকলেই চাকরি হারানোর ভয়ে নাম না প্রকাশের শর্তে এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, ‘অধ্যাপক ডা. লায়লা পারভীন বানু গত ২০১৭ সাল থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। অদ্যাবধি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তার নিয়োগ অনুমোদিত না হওয়ায় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা গত ৬ এপ্রিল বৈধ উপাচার্যের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু এই আন্দোলনের সাথে আমাদের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কোন সম্পর্ক নেই। তাহলে কেন আমাদের বেতন আটকে রাখা হয়েছে?’

ইংরেজি বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, ‘বৈধ উপাচার্য নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, আন্দোলন করল শিক্ষার্থীরা আর বেতন বন্ধ হল শিক্ষক-কর্মকর্তাদের এটা আসলে অমানবিক।’

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি, রেজিস্ট্রার এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মধ্যকার অন্তর্দ্বন্দকে ঘিরেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ ক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যস্ত রয়েছে।

প্রশাসনিক ভবনের মধ্যপদস্থ এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, “বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ভিসি এক প্রকার প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়েই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে হাত করে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন আটকে রেখেছেন।”

এর আগে, এ মাসের ১১ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. দেলোয়ার হোসেন স্বাক্ষরিত এক নোটিশ মারফতে বেতন বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়া হয়। নোটিশ প্রদানের ৫ মিনিট পর সেই নোটিশ উঠিয়ে নেওয়া হয় এবং একই তারিখ সম্বলিত সংশোধিত নোটিশে বেতন স্থগিতের কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে সেমিস্টার ফি প্রদান না করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অবনতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ সম্পর্কে সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আহ্বায়ক শেখ খোদারনূর রনি জানান, ‘এটা এক অমূলক এবং অযৌক্তিক পদক্ষেপ। কারণ আমরা শিক্ষার্থীরা প্রত্যেক সেমিস্টারের শুরুতেই সেমিস্টার ফি প্রদান করে থাকি। সুতরাং গত সেমিস্টার শুরু হওয়ার চার মাস পরে শুধুমাত্র এক মাসের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সেমিস্টার ফি দেয়নি বলে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন স্থগিতের যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে তা জঘন্য মিথ্যাচার এবং সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।’

শেখ রনি আরও বলেন, ‘মূলত শিক্ষার্থী এবং আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে আমাদের বৈধ ও যৌক্তিক আন্দোলনকে ব্যহত করার জন্যই প্রশাসন এ কুট চাল চেলেছে।’

রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগের একজন প্রভাষক বলেন, ‘আসলে ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী সারাদেশে গণতন্ত্র, মানবিকতা এবং জবাবদিহিতার দীক্ষা দিয়ে বেড়ালেও তার নিজের প্রতিষ্ঠানে এগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই। এখানে তিনি তার কতিপয় অনুসারীদেরকে দিয়ে এক রাজার রাজত্ব চালান এবং এ কারণেই এই রমজান মাসে তার আজ্ঞাবহ স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদেরকে দিয়ে বেতন বন্ধ করে দেওয়ার মতো হঠকারী, অমানবিক, অনৈতিক, অযৌক্তিক এবং স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।’

বেতন বন্ধ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক মো. মুক্তার আলী দীপু গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জিবি ক্লোজ ফ্রেন্ড’ নামক একটি ফেসবুক পেইজে আক্ষেপ করে লিখেছেন ‘গণ’র(গণ বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষকরা কি গাছের পাতা খেয়ে রোজা রাখবে!’

বেতন বন্ধ হওয়ায় এবং চলতি মাস প্রায় শেষ হওয়ার উপক্রম হলেও এই সমস্যার কোন সুরাহা না হওয়ায় আইন বিভাগের শিক্ষক এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা এক অনিশ্চয়তার ভিতরে বসবাস করছি। অথচ আমরা প্রতিদিন রুটিন অফিস করেছি। ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটোকে তালা ঝুলিয়ে দিলে আমরা রৌদ্র-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসের বাইরে রাস্তায় সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেছি। অথচ আমাদের কষ্টের-শ্রমের মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। বেতন-কড়ি না পাওয়ায় শিক্ষক-কর্মকর্তারা যেমন অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে তেমন সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্নের শিকার হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই সমস্যার আশু সমাধান দাবি করেন।

মেডিকেল ফিজিক্স এন্ড বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন, এমনিতেই আমাদেরকে কোন উৎসব ভাতা দেওয়া হয় না। তার উপর আবার বেতন বন্ধ রয়েছে এবং পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ঈদের আগে আমরা কোন বেতন পাবো না। এমন অবস্থা সত্যি অমানবিক এবং লজ্জার বলে তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, এটা নিয়ে উপাচার্যের সাথে কথা বলুন। শিক্ষকদের সাথে কথা বলে সত্যিকারের যেটা সেটা জানুন। রেজিস্ট্রার তো উপাচার্যের হুকুমের দাস, সেটা আপনারা ভালো করেই বুঝেন। যদিও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার একটু আলাদা, আমি অনেক কিছু করে থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। যদিও ভিসি বলে আপনাকে আমি বিশ্বাস করি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদিও রেজিস্ট্রারকে বিশ্বাস না করে তবে বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে চলবে? ছাত্রদের সাথে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার জন্যই রেজিস্ট্রারের নাম ব্যবহার করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ডা. লায়লা পারভিন বানুর সাথে একাধিকবার যোগাযোগের করার পরে সাংবাদিক পরিচয় দিলে ফোন রিসিভ করে তিনি জানান, ‘আপনাকে ধন্যবাদ, আমি এখন কথা বলতে পারব না, ঠিক আছে? থ্যাংক ইউ।’

পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান সমসামিয়ক সমস্যা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের অন্যতম সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, ছাত্ররা একটা আজগুবি সিদ্ধান্তে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিষয়ে ছাত্রদের নাক গলানোর কোন অধিকার নেই। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ ৩০০ জন শিক্ষক রয়েছে। কয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে এমন? তাহলে কি নিয়ে ছাত্ররা? টিউশন ফি সবচেয়ে কম, জায়গা জমি সবচেয়ে বেশি, খেলাধুলাতে, খেলাধুলাতে ভালো করলে তাতেও টিউশন ফি মাফ আছে। পড়াশোনা, ৯০ ভাগ ক্লাস উপস্থিতি উপরে টিউশন ফি ছাড় দেওয়া হয়। কিছু কিছু চক্রান্তিকারী মাথা খারাপ করেছে আর কিছু কিছু মাস্টার এজন্য দায়ী। টাকা না থাকলে শিক্ষকদের বেতন দিবে কোথা থেকে?

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তো প্রতি ছয় মাস অন্তর অন্তর মানে সেমিস্টারের শুরুতেই সেমিস্টার ফি দিয়ে দেয় এমন এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, না দেয় না। প্রত্যেক মাসে মাসেই টিউশন ফি আছে। সব বাকিই পড়ে। অনেকেই দিতে পারে না। আমরা ট্রাস্টিরা তো কোন বেতন, ভাতা নেই না। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ১০ কোটি টাকা দিয়েছে। জায়গা দিয়েছে দশ একর। তারা (শিক্ষকরা) ভেবেছে এটা উপাচার্যের সমস্যা। ভাই, টাকা না থাকলে বেতন কই থেকে দিব?

এক্ষেত্রে শিক্ষকরা কি করতে পারে এমন এক প্রশ্নের প্রেক্ষিতে তিনি জানান, শিক্ষকরা অন্য জায়গায় চাকরি নিতে পারে। অন্য জায়গায় চাকরি নিয়ে নেক। আমাদের তো টাকা নাই। সামর্থ্য নেই। ছাত্ররা ক্লাস করে না, তারা মাস্টাররা ক্লাসে যায় না। ছাত্রদের অনুপস্থিত করে নাই। শিক্ষকরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে না। তারা রাস্তায় এসে কেন বলেনি, ‘ছেলেরা তোমরা পাগলামি করো না।’ এইটায় কিছু করার নেই আমাদের।

এছাড়া গতকাল বিভিন্ন পত্রিকায় শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে আসার জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। সে প্রসজ্ঞে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী জানান, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপার। ছাত্রদের ক্লাসে ফেরার জন্য এটা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে না গেলে নাই। যে কয়জন ক্লাসে যাচ্ছে, গিয়ে ঘুরে আসতেছে। মেডিক্যাল যাচ্ছে, কয়েকটা বিভাগের মাস্টার্স যাচ্ছে। এক্ষেত্রে কি আমরা তাঁদের মারধর করব?

উল্লেখ্য, গত ৬ এপ্রিল থেকে বৈধ ভিসির দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে এবং আন্দোলনের অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত রেখেছে।

বিডি২৪লাইভ/এজে

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: