প্রচ্ছদ / জেলার খবর / বিস্তারিত

লোডশেডিং এ অতিষ্ঠ দীঘিনালার এলাকাবাসী

প্রকাশিত: ০৪:৩৮ অপরাহ্ণ, ২৩ মে ২০১৯

ছবি: প্রতিনিধি

খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ঘনঘন লোডশোডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন এলাকাবাসী। পবিত্র রমজান মাসেও চরম দুর্ভোগের মধ্যে তারাবীর নামাজ পড়তে, ইফতার এবং সেহরী খেতে হচ্ছে ৩টি উপজেলার প্রায় দেড় লক্ষ নাগরিককে। এই যায় এই আসে বিদ্যুতের যেন কোন ঠিক ঠিকানা থাকে না। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫-১৬ বার হচ্ছে লোডশেডিং আর ২৪ ঘন্টায় গড়ে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৬-৭ ঘন্টা। অথচ অফিস সূত্রে জানা গেছে দীঘিনালায় বিদ্যুতের কোন ঘাটতি নেই।

মঙ্গলবার (২১ মে) দীঘিনালার লোডশেডিং এর চিত্র থেকে দেখা যায়, সন্ধ্যা ৬টা বাজে বিদ্যুৎ চলে যায়, সেই বিদ্যুৎ আসে রাত ১.০৮ মিনিটে। এরপর সকাল ৫টায় বিদ্যুৎ চলে যায় আসে ৫.১৬ মিনিটে। আবার ৫.২৯মিনিটে বিদ্যুৎ চলে যায় আসে ৫.৪০ মিনিটে। এরপর আবার ৭.০৫ মিনিটে বিদ্যুৎ চলে গিয়ে আসে দুপুর ২.৪৭ মিনিটে। এর একটু পর ২.৫৩ মিনিটে আবারও বিদ্যুৎ চলে যায় আসে ৩.২১ মিনিটে। আর এটিই হলো দীঘিনালায় দৈনন্দিন  বিদ্যুতের লোডশেডিং এর চিত্র। কখনো কখনো এর থেকেও খারাপ অবস্থা দেখা যায় লোডশেডিং এর ক্ষেত্রে।

দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিদ্যুতের এই ঘন ঘন লোডশেডিং আর ভেল্কিবাজীতে জনসাধারণের মনে দেখা দিয়েছে নানান প্রশ্ন। এখানে আসলেই কি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে লোডশেডিং হচ্ছে নাকি দায়িত্বে অবহেলার কারণে  ইচ্ছেকৃত ভাবে বর্তমানে দেশব্যাপী বিদ্যুৎ উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে লোডশেডিং করা হচ্ছে?

খাড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা এবং রাঙ্গামাটির দুটি উপজেলা (লংগদু ও বাঘাইছড়ি) গুলোতে বিদ্যুৎ নেই বললেই চলে। বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপন্ন হলেও দীঘিনালায় তার যেন ছোঁয়া লাগেনি। রমজান মাস আসার আগ থেকে দীঘিনালা উপজেলার বিদ্যুৎ  অফিস থেকে জানানো হয়েছিল রমজান মাসে বিদ্যুতের কোন ব্যাঘাত ঘটবেনা। নির্দ্বিধায় সেহরী, ইফতার ও তারাবীর নামাজ পড়তে পারা যাবে তার জন্য উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগযোগ করা হয়েছে। কিন্তু রমজান শুরু হতে না হতেই দেখা দিয়েছে প্রতিদিন ১৫-১৬ বারের লোডশেডিং।

ঘনঘন লোডশোডিংয়ের কারনে ফুঁসে উঠেছেন এলাকাবাসী। তাদের অভিযোগ দীঘিনালা বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গাফলতিতে এমনটা হচ্ছে। সারা বছরে আসে রমজান মাস যেখানে আল্লাহর কাছে ইবাদত বন্দেগী করিয়ে জীবনের পাঁপ মোচনের মাস এই মাসেও বিদ্যুতের ব্যাঘাত ঘটার কারনে না পড়া যায় তারাবীর নামাজ, আর না সঠিক সময়ে খাওয়া যায় ইফতার ও সেহরী।

বিশেষ করে যারা বৃদ্বা বয়সে সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার করতে বসেন ঠিক সেই সময়ে বিদ্যুৎ চলে যায়। এমন বিদ্যুতের ব্যাঘাতে মুসল্লীরা তাদের সঠিক মত নামাজ সেহরী আদায় করতে পারছেননা। বার বার অভিযোগ করা সত্ত্বেও দীঘিনালা উপজেলা বিদ্যুৎ অফিস থেকে এমন লোডশেডিং বন্ধের  জন্য কোন গৃহীত ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

উপজেলার গ্রামাঞ্চলের জনসাধারণ অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যুৎ অফিসের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে কল করলেও রিসিভ করেন না, আবার নাম্বার বিজি করে রাখেন, একেক সময় দেখা যায় ওয়েটিংয়ে, আবার হঠাৎ যখন রিসিভ করে, তখন তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয় অতি অল্প সময়ের ভিতরে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ৪/৫ ঘন্টা হয়ে গেলেও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয় না। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘনঘন লোডশোডিংয়ের কারনে মুসল্লীদের ব্যাপক দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। সময়ে অসময়ের বিদ্যুতের দুর্গতির দায়ভার কে নেবে? এমন প্রশ্ন উপজেলা বাসীর।

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে গিয়ে দীঘিনালা উপজেলার বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী (আর-ই) অশোক দাসের দায়িত্বে অবহেলার কারণে লোডশেডিং এর বিষয়টি  উঠে এসেছে।  তিনি একেক প্রশ্নে একেক মন্তব্য করেছেন। যেখানে বিদ্যুতের লোডশেডিং নিয়ে এলাকায় তোলপাড় হচ্ছে সেখানে তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, দীঘিনালায় বিদ্যুতের কোন সমস্যা নেই। যা খুবই হাস্যকর। এই বিষয়ে গত ১৩ মে দীঘিনালা উপজেলার বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী (আর-ই) অশোক দাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে নানান ব্যস্ততা দেখিয়ে এই বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এসময় তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতেও রাজি হননি। তখন তিনি বার বার জেলা প্রকৌশলীর অনুমতি ছাড়া কোন মন্তব্য করা যাবে বলে এই প্রতিবেদককে জানাচ্ছিলেন।

এরই মধ্যে উপজেলাবাসী লোডশেডিং এ অতিষ্ট হয়ে তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় তুলে। কেউ কেউ তুলে ধরেন দায়িত্বে অবহেলা সহ তার নানান অন্যায় কথা। এসময় জুলহাস সুজন নামে এক বিদ্যুৎ গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, ‘তারা আন্ধাজের উপর বিল করে। আমি এখনো প্রায় ৯০০ ইউনিট পাওনা আছি। এ বিষয়টি আর-ই কে বলতে গিয়েছিলাম, আর তিনি আমাকে মামলার ভয় দেখিয়েছেন।’

বশির আহমেদ রাজু বলেন, ‘দীঘিনালা বিদ্যুৎ বিভাগের নৈরাজ্য নিয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে কঠোর আন্দোলনে যাওয়া জরুরি। আর কত দিন এভাবে?’

বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু করুণা বংশ ভিক্ষু বলেন, ‘সরকারকে বেকায়দায় ফেলানোর জন্য বিদ্যুৎতের এতো লোডশেডিং নয় তো? কর্তৃপক্ষের সু-দৃষ্টি কামনা করছি। দীঘিনালার বিদ্যুৎ ঠিক আগের মত। এখানে আর-ই সাহেবের অবহেলাই বড় কারণ।’ 

জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সচেতন দীঘিনালা বাসির ব্যানারে বিদ্যুৎ নিয়ে ঝাড়ু মিছিল এর প্রয়োজন আছে কি? সারাদিন যেখানে বিদ্যুৎ সোনার হরিণ,সেখানে যতটা সময় বিদ্যুৎ আসে তাও আবার আমাদের তালতো বোন  মনে করে দুষ্টমি করে, আর মাসের শেষে বিদ্যুৎ কর্মকর্তার বাপের টাকার মতো মোটা অংকের বিল দিয়ে যাই,আর পরিশোধ করতে দেরি হলে লাইন কেটে দিবে, আর বিদ্যুৎ নিয়ে কোন কথা বলতে গেলে বিদ্যুৎ কর্মকর্তার পার্ট দেখে মনে হয় তিনি ডিসি হয়ে বসে আছেন।’

মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এতো সুন্দর পরিবেশেও দীঘিনালায় বিদ্যুৎ নেই, এই শা,বেটারা বিদ্যুৎ বন্ধ কইরা রাখছস কেন?’ এভাবেই শত শত অভিযোগ আর মন্তব্যের ঝড় বইছে  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

অভিযোগ পাওয়ার পর ২২ মে আর-ই এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি  আবারও বেফাস-হাস্যকর কথাবার্তা বলেন এই প্রতিবেদকের সাথে। তিনি বলেন, ‘এখানে বিদ্যুতের কোন সমস্যা নেই। এখানে ঘণ ঘণ লোডশেডিং এর প্রশ্নই আসেনা। তবে আমাদের এখানে ৩ টি পাওয়ার ট্রান্সফার রয়েছে এর মধ্যে একটি নষ্ট হওয়াতে ভালভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। আর জ্বর-তুফানের কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখতে হয়।

কিন্তু প্রতিদিন ১৫-১৬ বার কেন লোডশেডিং হচ্ছে? আর জ্বর-তুফান তো প্রতিদিন থাকেনা তবুও কেন লোডশেডিং হয় এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখন ব্যস্ত আছি। আপনি জেলা প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেন।’ যেখানে লক্ষাধিক নাগরিকের বিদ্যুৎ সেবা ব্যহত হচ্ছে সেখানে বিদ্যুৎ নিয়ে দীঘিনালা আর-ই’র এমন কথাবার্তা কতটুকু বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করবে?

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ি জেলা (পিডিবি) প্রকৌশলী কামাল উদ্দিন আহমেদের সাথে কথা হলে তিনি  বলেন, ‘আসলে দীঘিনালার আর-ই যেটা বলেছেন সেঠা সঠিক নয়। ৩টি ট্রান্সফার এর মধ্যে যদিও একটি ট্রান্সফার নষ্ট তবুও সেখানে বিদ্যুতের কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। দীঘিনালা সাব স্টেশনের আওতায় বিদ্যুতের যে চাহিদা রয়েছে সচল দুটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার দিয়েই সে চাহিয়া মেটানো সম্ভব। আর যে ট্রান্সফরমারটি নষ্ট হয়েছে সেটি আমরা এক সপ্তাহের ভিতরেই পরিবর্তণ করে তা সচল করব। আর আর-ই'র দায়িত্বে অবহেলার কারণে যদি লোডশেডিং এর ঘটনা এবং গ্রাহক হয়রানীর ঘটনাগুলো ঘটে থাকে তাহলে আমরা অবশ্যই তার ব্যপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

বিডি২৪লাইভ/এজে

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: