ঢাকা, বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

নজরুল কেন গুরুত্বপূর্ণ?

০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৫:৩৫:০০

আরেফিন আল ইমরান: জাতীয় কবি নজরুল ইসলামকে মূলতই কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার, সুরকার হিসেবে দেখার প্রবণতা বাঙ্গালি সমাজে বিদ্যমান। আবার অনেক ক্ষেত্রে তাকে কেবল ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে দেখা হয়েছে, যা তাকে সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ করে ফেলে। এসবের বাইরে গিয়ে নজরুলের কীর্তি, সক্ষমতা, চিন্তা বা তৎপরতার বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা— আমরা সেই অর্থে পাই না। অথচ এতো বিপুল ও বৈচিত্যময় একটি মহৎ প্রতিভাকে জানবার ও বুঝবার লক্ষ্যে তার সামগ্রিক তৎপরতার অভিমুখ বোঝা অত্যন্ত জরুরি। এ লেখাতে তার কতিপয় দিক উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে যেগুলো অপেক্ষাকৃতভাবে কম আলোচিত। কালের সেই প্রেক্ষাপটে জাতীয় কবির গুরুত্ব বোঝার লক্ষ্যে জন্য চলুন সেইসব কারণগুলোর প্রতি আলোকসম্পাত করা যাক।

১) আত্নপরিচয় বিনির্মাণ: এটা ছিল সেই সময়— যখন ইতিহাস দাবী করছিল একটি বজ্রনির্ঘোষ। দিকভ্রান্ত ও নিপীড়িত সমাজের মানুষের মাঝে প্রেরণা সঞ্চারের জন্য প্রয়োজন ছিল তীব্র আঘাতের। ১৯২২ সালে, তারই প্রেক্ষিতে প্রথম শোনা গেল এক মহাবিদ্রোহীর কণ্ঠস্বর। উদয়কালেই বোঝা গিয়েছিল-এ কন্ঠস্বর সহসা হারিয়ে যাবার নয়। কালের অর্পিত দায়িত্বকে এই কন্ঠস্বর বহুদূর এগিয়ে নেবে। কাজী নজরুল ইসলামের ধূমকেতুর মত উত্থান পরিষ্কার করে দিল— অধঃপতিত সমাজের মূল কর্তব্য। ঔপনিবেশিক আক্রমণের সমান্তরালে সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হল জোর কদমে। সনাতন ধর্মের পৌরাণিক কিংবদন্তির পাশাপাশি মুসলিম সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাস উঠে এল কবিতার ছত্রে, ছত্রে। সংগীত, প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস সেই চেতনাকে আরো সুসংহত করল। তার ভঙ্গিতে কোনো জড়তা বা হীনমন্যতা ছিল না। পদক্ষেপ ছিল দৃঢ় এবং সচেতন। তার প্রচেষ্টা ছিল ঐকান্তিক এবং আদর্শ উজ্জীবিত। অজস্র সমালোচনার বিপরীতে তাই তার গতি বিন্দুমাত্রও রুদ্ধ হয়নি, বরং বেগবান হয়েছে। মুসলিম সমাজ ফিরে পেল সাহিত্যে প্রবেশের শক্তিশালী প্রেরণা। জাতিগত হতাশার ভিড়ে ক্রমান্বয়ে আস্থার জায়গা তৈরি হতে থাকল। এটা সেই সময়, যখন রবীন্দ্র বলয়ের বাইরে পা রাখাই ছিল রীতিমত দুঃসাহস। পত্রিকা বের করা, নিজস্ব রীতিতে গল্প, কবিতা, উপন্যাস রচনা করা ছিল-চূড়ান্ত স্পর্ধা। আর সংগীতে যে বৈপ্লবিক চিন্তার প্রকাশ আমরা দেখলাম, তা এক কথায়- অনন্যসাধারণ। শাস্ত্রীয় সংগীতে জারিত হয়ে, তার গান যেন এই উপমহাদেশে এক নতুন ভাবের জন্ম দিল। তাতে কোনো হিংসা-বিদ্বেষ নেই, আছে সৌহার্দ্য, প্রেম ও সম্প্রীতির বোধ। একই সাথে ইতিহাস সচেতনতা এবং আরবি-ফার্সী শব্দের শিল্পায়িত প্রয়োগ যেন নন্দনতত্ত্বের এক স্পর্শাতীত উদাহরণ। এসব কিছু দিয়ে তিনি যাদের ঘুম ভাঙ্গাতে চাইলেন, তারা আবেশ জড়ানো চোখে তাকে দেখল। প্রতিভার স্বীকৃতি দিল। সাংস্কৃতিক আইকন বলে স্বীকার করল। কিন্তু তার মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থেকে ক্রমাগত দূরে সরে গেল। তবু উপমহাদেশের নিপীড়িত সমাজের আত্নপরিচয় বিনির্মাণে, তার ভূমিকা ঐতিহাসিক।

২) সত্য ও সুন্দরের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা: কাজী নজরুল ইসলাম সেই আলোকবর্তিকা যিনি পরবর্তী সত্যপ্রেমীদের মনে ব্যাপক সাহস ও প্রেরণা সঞ্চার করেছে। তার কবিতা যেমন তিরিশের প্রধান কবিদের প্রভাবিত করেছে, তেমনি সংগীত পরিচালক ‍ও সুরকারদের দিয়েছে ব্যতিক্রমী উদ্ভাবনের শক্তি। বুদ্ধদেব বসু তার সমালোচনা করেছেন অনেক। কবি হিসেবে কেবল হাঁক-ডাকসর্বস্ব হিসেবে তাঁকে অাখ্যায়িত করেছেন। গীতিকার হিসেবে তাকে স্বীকার করলেও, কঠোর সমালোচনা করেছেন আবেগের আধিক্য ও শব্দচয়নের অপরিমিতির জন্য। পরিশেষে দেখা গেল-এই নজরুলই হয়ে উঠলেন নতুন কবিদের স্পিরিট। জীবনানন্দের কবিতায় যে আরবি-ফার্সীর প্রয়োগ দেখা যায়-তার প্রেরণাটুকু নজরুলই যোগান দিয়েছিলেন। বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্ররা অন্য সব ভূমিকা অস্বীকার করলেও, রবীন্দ্রভূমিকার বিপরীতে অবস্থান নেওয়ার অগ্রজ হিসেবে নজরুলের প্রচ্ছন্ন প্রভাব ম্লান হয়নি। তার শক্তিসম্ভার বিস্ফোরিত না হলে, বাংলা শিল্প-সাহিত্যের জগৎ একঘেয়েমীর আধিপত্যে পর্যবসিত হত। সমালোচকরা অন্যদের কৃতিত্ব ফলাও করতে চাইলেন, কিন্তু কালক্রমে নজরুলের আলো অদম্য গতিতে বিকশিত হল। অনেক অনুজের মাঝে প্রবাহিত হল তার উত্তরাধিকার। যুক্তিবর্জিত সমালোচনায় তার কালজয়ী প্রভাব প্রতিহত করা যায়নি।

৩) সাংস্কৃতিক তৎপরতার নতুন বিন্যাস: মানুষের প্রয়োজনে শিল্প-সাহিত্যের ব্যবহার নজরুলের আগেও অনেকে করেছেন। কিন্তু বাংলা ভাষায় ও উপমহাদেশের বাস্তবতায়, এতো প্রবলভাবে অন্য কারো উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি না। নজরুল মানেই অন্তুর্গত শক্তির এক বিপুল প্রদর্শনী। দেশ ও সমাজকে সে শক্তি নতুন বিন্যাস প্রদান করে। মানুষের আত্নশক্তিকে শাণিত করে। সমাজের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে তা গর্জে উঠে। এটা সত্য যে, তার প্রতিভা সুনির্দিষ্ট তত্ত্বের আলোকে সামাজিক অবক্ষয়ের মোকাবেলা করে না। উপরন্তু আবেগের অপরিমিত শক্তি নিয়ে, খেয়ালীভাবে অগ্রসর হয়। এজন্য তার সমালোচনা করা যায় না। কারন তিনি রাজনীতিবিদ বা সমাজসংস্কারক নন। তার আগ্রহের জায়গা আধিকার করে ছিল সংস্কৃতি। অপরিণত সমাজ ব্যবস্থার মানসগঠনের তাগিদে, সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালনকেই তিনি নিজের দায়িত্ব জ্ঞান করতেন। এর জন্য তার মাঝে আক্ষেপ ছিল না। চাইলেই তিনি নারী রূপ, ফুল, পাখি, মেঘ, বৃষ্টি, প্রকৃতি এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারতেন। কিন্তু নজরুল তার চিন্তার বিন্যাসে নতুন প্রকরন হাজির করলেন। সমাজব্যবস্থাকে পরিণত ও মননসমৃদ্ধ করার তাগিদে সংস্কৃতির নতুন বিন্যাস তৈরি করলেন সাহসীভাবে। কবিতা, গান, প্রবন্ধকে এরকম আধিপত্যবাদবিরোধী যুদ্ধে অবতীর্ণ করার নজির উপমহাদেশে খুব বেশি নেই। থাকলেও তার প্রভাব ও প্রাবল্য নজরুলকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মত নয়। আমরা বিশ্বসাহিত্যে ওয়াল্ট হুইটম্যান, ফেদেরিকো লোরকা, পাবলো নেরুদাসহ অনেককে এমন কৃতিত্ব স্থাপন করতে দেখেছি। কিন্তু নজরুল যেভাবে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং অনাপোষী মনোভাবে লড়াই করেছেন, তা অনন্যসাধারণ। আর্ট ফর হি্ম্যউন সেকের তত্ত্বে, তার চেয়ে সক্রিয় ব্যক্তিত্ব পাওয়া কঠিন। এদিক থেকে ইতিহাসে তাকে অন্যভাবে বিচার-বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে।

৪) ধর্মীয় চিন্তায় পুনর্গঠন: এর আগে গৌতম বুদ্ধ, গুরু নানক, কবীর, শ্রী চৈতন্য, লালন শাহ, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, বিবেকানন্দসহ অনেক মহান মানুষ উপমহাদেশের ধর্মীয় চিন্তাকে বিভিন্নভাবে পুনর্গঠন করেছেন। নজরুলের ধর্ম চিন্তা এক্ষেত্রে বেশ স্বতন্ত্র্য। মানুষকে কোনো একটি সম্প্রদায়ের আলোকে বিবেচনার চেয়ে, তাকে বৃহত্তর মানবজাতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই ছিল-তার অনন্য বৈশিষ্ট্য। যেসময় হিন্দু-মুসলিম দ্বৈরথ উপমহাদেশের স্বাধীনতা, প্রগতি ও উন্নয়নের প্রতিবন্ধক ছিল, সেসময় ঐক্যের বাণী প্রচারকেই তিনি কর্তব্য ভেবেছেন। অর্থাৎ ইতিহাসের মহত্তম প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি মানবতার উদার আদর্শ সম্প্রসারনে তিনি কাজ করেছেন। যে কলম শ্রী কৃষ্ণের মাহাত্ন্য প্রচার করেছে, সেই একই কলম মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মাহাত্ন্যও বয়ান করেছে। জাতীয় ঐক্য ও মেলবন্ধন রক্ষার তাগিদে পৃথকভাবে হিন্দু ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে কাজ করেছেন। তার চিন্তায় যেমন বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত কাজ করেছে, তেমনি কাজ করেছে ইসলামের ইতিহাস ও স্পিরিট। ধর্মীয় বৈপরীত্য সত্ত্বেও মানবতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। উভয় শিবিরের সাংঘর্ষিক জায়গাগুলো এড়িয়ে, ঐক্যের দীপ জ্বালিয়েছেন। কিংবদন্তি ও মিথলজির প্রয়োজনীয় উদাহরণ ব্যবহার করে, সমৃদ্ধ করেছেন শিল্প-সাহিত্যের ভান্ডার। একাধিক ধর্মের স্পিরিটকে এভাবে বিবৃত করার প্রয়াস, আমরা এই উপমহাদেশে আর এতোটা জীবন্তভাবে পাইনা। অন্য সাধকদের চেয়ে নজরুলের পার্থক্য এই যে, তিনি কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের উন্নতি চাননি। ভারতের প্রতিটি মানুষ যাতে বিভেদ ভুলে ঐক্যের কাতারে শামিল হয়—এটা তিনি নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। ধর্মীয় পুনর্গঠনে সাংস্কৃতিক উদ্যোগ ও তৎপরতার যে অনন্য নজির তিনি স্থাপন করেছেন, তা পরবর্তীতে সেভাবে গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেনি।

শেষ কথা: শিল্প সাহিত্য যদি ব্যক্তি অনুভূতি ও আবেগকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়, তবে তাতে অন্যায়ের কিছু নেই। কেবল নদী, নারী, নক্ষত্র, ফুল, পাখি, প্রেম, বিরহ ইত্যাদি নিয়েও তার সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ রয়েছে। আবার ইতিহাসমুখীতা, মানবতাবাদ, প্রতিবাদ, বিপ্লব, সাম্য, সংহতির আলোকে উপস্থিত হওয়ার বিকল্পও রয়েছে। কাজী নজরুল ইসলাম এই উভয় তত্ত্বের ক্ষেত্রেই সার্থক ব্যক্তিত্ব। শিল্পকলার আলোকে তার অনেক ধরনের আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। সামনে আরো হবে। কিন্তু উপরে বর্ণিত চারটি বৃহত্তর কারনে তিনি পৃথিবীতেই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেন। অবশ্য এই চিন্তাটি মোটেও সর্বশেষ কথা নয়। এমন আরো অনেক কারন রয়েছে যার আলোকে তাকে ব্যতিক্রমী করে দেখা যায়। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্য আরো গভীর হওয়া উচিত। যে প্রেক্ষাপটে এবং যে কারনে তাকে এসব ভূমিকা নিতে হয়েছে, তার স্বরূপ বিশ্লেষণ করাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ। আপাতত নজরুলকে আবেগ দিয়ে বিশেষায়িত না করে, চিন্তার আলোকে বিশ্লেষণ করার উদ্যোগকেই বড় মনে করি।

লেখক: আরেফিন আল ইমরান (সাংবাদিক ও সঙ্গীত পরিচালক)

বিডি২৪লাইভ/টিএএফ

সর্বশেষ

এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বিডি২৪লাইভ মিডিয়া (প্রাঃ) লিঃ,
বাড়ি # ৩৫/১০, রোড # ১১, শেখেরটেক, মোহাম্মদপুর, ঢাকা - ১২০৭
ই-মেইলঃ info@bd24live.com

বার্তা প্রধান: ০৯৬১১৬৭৭১৯০
নিউজ রুম: ০৯৬১১৬৭৭১৯১
মফস্বল ডেস্ক: ০১৫৫২৫৯২৫০২
ই: office.bd24live@gmail.com

Site Developed & Maintaned by: Primex Systems