বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, দেনা-পাওনার হিসেব

প্রকাশিত: ২৫ মে ২০১৮, ০৫:৩৯ পিএম

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে গত নয় বছরে ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে।

গত নয় বছরে দুই দেশ যেসব বিষয়ে চুক্তি করেছে, সেটি একটি সময়ে অনেকে ভাবতেও পারেননি। এ সময়ের মধ্যে ভারতে সরকার বদল হলেও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কে এখনো কোন ভাটা পড়েনি।

ছিটমহল বিনিময়, ভারতকে সড়ক পথে ট্রানজিট দেয়া, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেয়া, ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংবা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে বাংলাদেশের সহায়তা- এসব কিছুতে অগ্রগতি হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস মনে করেন, গত নয় বছরে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে লেনদেন হয়েছে সেটি বেশ উল্লেখযোগ্য।

তিনি বলেন, ভারতে কংগ্রেস সরকারের বিদায় ও নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ কিছুটা হয়তো চিন্তিত ছিল। কারণ মোদি যে শ্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন সেগুলো 'ভয়াবহ' ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

কিন্তু তারপরেও দু'দেশের সম্পর্ক এগিয়েছে বলেন সাবেক এই রাষ্ট্রদূত। এছাড়া দুই দেশের মধ্যে স্থল ও সমুদ্র-সীমা নির্ধারণ, ছিটমহল বিনিময় এসব বিষয়ে অগ্রগতি একটি বড় অর্জন বলে মনে করেন তিনি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি নাগরিকদের যেমন ভারতে যাওয়ার সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে, তেমনি ভারত থেকে বাংলাদেশে আসার সংখ্যাও বেড়েছে। ভারত সরকার বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা দেবার বিষয়টি আগের তুলনায় সহজ করেছে।

আসা-যাওয়া বাড়লেও বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়া এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে ভারতের চাপ দেবার বিষয়টি বাংলাদেশের ভেতরে নানা সমালোচনা রয়েছে।

একটা ধারণা প্রচলিত রয়েছে, বাংলাদেশে ক্ষমতার পালা বদলের সাথে ভারতের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভূমিকা আছে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশের একতরফা নির্বাচনে ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন অনেক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, দুই দেশের সরকারের মধ্যে ভালো সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণ সেটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করছে সেটিও বিবেচনা করতে হবে। বিগত সাধারণ নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভারত যে ভূমিকা নিয়েছিল সেটি বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবে দেখেনি।

তিনি বলেন, কোন স্বাধীন দেশের মানুষই তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য একটি দেশের কোন ধরনের হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না।.... দুটা স্তরে সম্পর্কটা তৈরি হয়। একটা হচ্ছে, সরকার এবং সরকার এবং অপরটি হচ্ছে জনগণের এবং জনগণের মধ্যে। সম্পর্ক যদি টেকসই হতে হয়, দীর্ঘমেয়াদি এবং বিশ্বাসযোগ্য হতে হয় তাহলে দুই দেশের মানুকে মনে করতে হবে যে এ সম্পর্কে আমি লাভবান হচ্ছি। তবে দুই দেশের সম্পর্কে অনেক অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বেশ কিছু সমস্যার সমাধান হয়েছে। এর মধ্যে স্থল এবং সমুদ্র-সীমা নিস্পত্তি।

বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৯৮% পণ্য ভারতে বিনা শুল্কে প্রবেশের অধিকার লাভ করেছে। সেটা বাংলাদেশ কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে এবং অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভ করতে পেরেছে সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ বলে উল্লেখ করেন কবির।

বাংলাদেশে এ বছরই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার কথা।

সম্প্রতি ভারতের একটি সুপরিচিত গবেষণা সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বলেছে, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকরা দুর্ভাবনায় রয়েছে। রাজনৈতিক দল হিসেবেও আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো: জমির, যিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্যও বটে, মনে করেন একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ ভারতের জন্য বেশি প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ভারতকেও স্থিতিশীল রাখবে। সে বিষয়টি আওয়ামী লীগ সরকার নিশ্চিত করার কারণেই ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে পছন্দ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের একের পর এক ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশ সরকার সেটি কখনোই স্বীকার করেনি। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে শেখ হাসিনার সরকার যে ভূমিকা নিয়েছে সেটি ভারতের জন্য একটি বড় পাওয়া।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. জমির বলেন, ভারত কখনোই চায় না যে বাংলাদেশ তার কোনায় বসে এমন একটি অস্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছুক যেটি ভারতকেও প্রভাবিত করবে। এখন ভারত যদি মনে করে, যে রাজনৈতিক দল এখন আছে তাদের কারণে আমরা (ভারত) শান্তিতে থাকতে পারবো তাহলে অবশ্যই তারা সে দলকে পছন্দ করবে। ... এ সার্বিক দিকটা ভারত দেখছে এবং বুঝছে যে যদি বর্তমান সরকার থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অস্থিতিশীল পরিবেশের বদলে একটা স্থিতিশীল আসবে।

দেশের ভেতরে অনেকেই মনে করেন, গত নয় বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ভরতের স্বার্থকে যতটা প্রাধান্য দিয়েছে, বিনিময়ে ভারতে বাংলাদেশকে ততটা মূল্যায়ন করেনি এবং এ বিষয়টি ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা দরকার। তবে যেহেতু এটি নির্বাচনের বছর, সেজন্য বাংলাদেশর সাধারণ নির্বাচনে ভারত কী ধরনের ভূমিকা পালন করে সেটিকে অনেকের দৃষ্টি থাকবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

এরই মধ্যে ভারতের গবেষণা সংস্থা অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বলেছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কারো ক্ষমতায় আসার বিষয়টিকে ভারত উদ্বেগের চোখে দেখে। বিবিসি


বিডি২৪লাইভ/এএইচআর

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

পাঠকের মন্তব্য: