ঢাকা, বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৯

সোহাগ হোসেন

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

প্রতিটা এতিমের ভালবাসার গল্প এমনি হয়! 

১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:৪৮:০০

আমি তোমার সাথে এতদিনে সব মিথ্যা বলেছি, মাফ করে দিও। আমি একজনের বাড়ীতে থাকি। আমার কোন নিজস্ব বাড়ী নেই। জানিনা আমার বাবা মা কে। কখন মায়ের হাতের স্পর্শ অনূভব করি না। তবে মায়ের অভাব খুব করে অনুভব করি। বুঝার পর থেকে আমি একটি এতিমখানায় বড় হয়েছি। শহরের একটি এতিমখানাতে থাকতাম। এতিমখানায় যারা থাকে তাদের তো মা বাবা পরিবার কিছু থাকে না। তাই সেই ছোট্ট থেকেই জেনে এসেছি আমার মা বাবা নেই। মা বাবা পরিবার কাছের মানুষ থাকলে তো আর এতিম হয়ে থাকতে হয় না তাদের।

অন্যদিনের মত সেদিনও সকালে উঠে এতিমখানার ভেতরের মাঠটা পরিষ্কার করছিলাম। হটাৎ একটা লোক আমার দিকে হেঁটে এগিয়ে আসলো। কাছে আসলে আমি সালাম দিলাম। তিনি সালামের উত্তর দিলেন। তারপর তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল বাবা তোমার নাম কি? বললাম হুজুর আমাকে সালাম নামে ডাকেন।

তারপর তিনি কথা বলতে শুরু করলো। অনেক ধরনের কথা জানতে চাইল। আমি কখনো তো স্কুলে পড়িনি। তাই আমার কথাগুলোর মধ্যে সব অসংলগ্নতা ফুটে উঠছিলো। তিনি হটাৎ বললেন তুমি আমার বাড়ীতে যাবে? আমার পরিবারে সাথে থাকবে?

আমি তো অবাক হলাম প্রথমে। তারপর বললাম আমাকে কেন আপনার বাড়ীতে রাখবেন?

জবাবে তিনি বলল, তোমাকে আমার খুব ভাল লেগেছে। আমি তোমার দায়িত্ব নিতে চাই। তখন আমি বললাম এখানে আমার নিজের কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস নেই আপনি বরং হুজুরের সাথে কথা বলুন।

তারপর তিনি হুজুরের সাথে প্রায় ৩ ঘন্টার মত কথা বললেন। শেষে হুজুর সম্মতি জানালেন। তারপর কিছুদিন পর তিনি আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। প্রথমে তার বাড়ী আসলে সবাই কেমন একটা দূরত্ব রেখে রেখে চলতো। আমি একা ছিলাম। একটা রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। যখন মাদ্রাসায় ছিলাম তখনও অবসরে বসে আমিও পরিবারের স্বপ্ন দেখতাম। পরিবার ছাড়া একটি এতিম বাচ্চার দূরত্ব কত সেটা ভাবতাম। তখন মনে হতো আমার মত পৃথিবীর সব এতিম বাচ্চার একই ধরনের চিন্তা করে।

যায়হোক, এরপর ওনি আমাকে একটা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন আর পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা চালু রাখার জন্য একটা হুজুর বাড়ীতে রেখে দিলেন। আমি ধীরে ধীরে এখানকার পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করলাম। ভোরে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে হুজুরের কাছে আরবি শিক্ষা নিতে শুরু করলাম তারপর স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম। প্রায় পাঁচ মাস সময় লেগেছিলো ওই পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে। ধীরে ধীরে এই বাড়ীর সকলে আমার সাথে কথা বলতে শুরু করে। সবাই ভাল ব্যবহার করে। আমি পুরোপুরিভাবে তাদের পরিবারে সদস্য হয়ে গেলাম। কখনো বা রাগ আবার কখনো অভিমান করেছি।

এরপর স্কুলে পড়া শেষ করে কলেজে পড়েছি। সব খরচ আমি যাদের বাড়ীতে থাকি ওনারা দিয়েছেন। ওনারা আমার বাবা, মা সব কিছু এখন। ওনাদের পরিচয়ে বড় হয়েছি। আমি বর্তমানেও সেখানে আছি। এখন আমি এই পরিবারের সদস্যদের একজন। তাদের কাছে অনেক কিছু দাবী করি। তারা আমার সব ইচ্ছে আর দাবীগুলো সাথে সাথে পূরণ করেন। স্পেশাল মুহুত্বগুলো আমরা সকলে এক সাথে কাটায়। আমার বয়স এখন ২৭। পড়াশুনা শেষ করেছি। সকল কৃতিত্ব ওই মানুষটার যিনি আমাকে এখানে নিয়ে এনেছিলেন।

জীবনে কখনো বাবা মাকে দেখিনি। বাবা মায়ের ভালবাসা কেমন জানিনা। কারও ভালবাসা পায়নি কখনো। ছোট্ট বেলায় এতিমখানায় থাকতাম তাই সবার সহানুভূতি পেয়েছি যথেষ্ট। ছোট বেলা থেকে অভাব ছাড়া আর কিছুই দেখিনাই আমার জীবনে। ৫ টাকা পাওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছি। সেই ৫ টাকা রেখে দিয়েছি অনেক দিন পর্যন্ত। তারপর একদিন ১ টাকা দিয়ে ২ টা লজেন্স খেয়েছি। জীবনের শুরুর দিকে কখনো কোন ভাল খাবার খায়নি। যখন এতিমখানায় থাকতাম কত মানুষকে দেখেছি কত ভাল খাদ্য খেতে। সে সময়ে আমারও ইচ্ছে হতো ওই সব খাদ্য খেতে। থাকি এতিমখানায় তাই সে সব ইচ্ছাকে নিজের বুকের মধ্যে চেপে রেখে দিতাম। থাকতাম এতিমখানায় তেমন ভাল খাদ্য খেয়ে জীবনের শুরুটা হয়নি। এমনও হয়েছে মাঝেমধ্যে না খেয়ে থাকতে হত।

আমি তো আসলে কখনো বুঝতে পারিনি পড়াশুনা করতে পারবো। পড়াশুনা ছিল কল্পনার অতিতে।
কিন্তু ছোট বেলা থেকে আমার ইচ্ছা ছিল আমি অনেক বড় হব। তাই ছোট থেকে আমি কঠোর পরিশ্রম করতে শিখে নিয়েছিলাম। নিজের কিছু না থাকলে আসলে পরিশ্রম করে বৃথা সময় নষ্ট ছাড়া কিছুনা । পড়াশুনা করেছি অন্যের টাকায়। কখনো খেয়েছি আবার কখনো দু' তিন দিন না খেয়ে থেকেছি। এরই মধ্যে বড় হয়েছি, ভালবেসেছি।বুঝেছি জীবনকে। বুঝেছি একটা এতিমের জন্য পৃথিবী কতটা অসহায়।

"হটাৎ আমার জীবনে তুমি আসলে। আমি আগে থেকেই জানতাম এতিম বাচ্চাদের স্বপ্ন দেখার কোন অধিকার থাকেনা। তবুও ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে স্বপ্ন দেখেছি তোমাকে নিয়ে। জীবনের সবটুকু দিয়ে ভালবেসেছি তোমাকে। আমার সত্যিকারের ভালবাসাকে উপলব্ধী করে তুমিও বিশ্বাস করেছো আর ভালবেসেছো হৃদয় উজাড় করে দিয়ে। এরই মধ্যে দূরত্ব কাটিয়ে দু'জন কাছে এসেছি,অনেক কাছে। যতটা কাছে আসলে আর কখনো দূরে যাওয়া সম্ভব নয়। ভালবেসেছি যতটা ভালবাসলে কখনো ছেড়ে থাকা সম্ভব নয়। কোন ফিউচারকে না ভেবেই ভালবেসেছি। তবে এতটুকু নিশ্চিত ছিলাম যে দিন তুমি জানতে পারবে আমি এতিম বাবা মা পরিবার নেই। সে দিন আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তবে এতটুকু বিশ্বাস ছিল তুমি আমাকে পাগলের মত ভালবাসতে সব জানার পরেও কখনো ছেড়ে যাবেনা।

সত্যিই বলতে কি জানো আমি কখনোই তোমার যোগ্য ছিলাম না। আমার বাবা মা কে সেটা আমি জানিনা। তোমার ফিউচার কতটুকু ভাল সেটা আল্লাহ্ জানেন ভাল। তবে জানি তুমি ভাল একটা মানুষ।তোমার ফিউচার অনেক ভাল হবে। আজ সব সত্যিটা জানার পরে হয়তো তুমি আমার থেকে দূরে চলে যাবে নয়তো দ্বীগুন ভালবাসবে। মনে পড়ে গেল এর আগে ক্লাসে যাদের সাথে ফ্রেন্ডশিপ হত। এক বেঞ্চে বসতাম। এক সাথে খেলতাম। তারা যখন জানতে পারতো আমি এতিম বাবা মা নেই তারা আর কখনো আমার সাথে কথাও বলতো না। আমি ক্লাসের এক কোনায় বসতাম একা একা। তখন সত্যিই অনুভব করতাম একটা বাবা মা পরিবার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আসলে তখন বুঝতাম না দূরত্বটা কি। তবে এখন বুঝি এতিমকে দেখলে সবাই দূরত্ব বজায় করে চলে। তুমি সত্যিটা একদিন তো জানতে-ই পারতে তাই আজ বলে দিলাম। জানি সেই স্কুলের বন্ধুদের মত তুমিও আর কখনো রিলেশন রাখবেনা, কখনো আর কাছে আসবেনা। হয়তো আর ভালও বাসবেনা। বিশ্বাসঘাতকের মত সত্যি করে ভালবেসেছি এটাকে তুমি কখনো মেনে নিতে পারবেনা জানি।
কি করবো বল, একজন এতিমের জন্য পৃথিবীটা বড়ই অসহায়। হাজার পরিশ্রমের বিনিময়ে হলেও যদি মা বাবাকে পেতাম তাহলে সার্থকতা ছিল বেঁচে থাকায়। যদি আমার মা বাবা বেঁচে থাকে তবে তারাও কি আমাকে একই ভাবে মিস করে? না কি তারা বেঁচে নেই ?

যেখানেই থাকে তারা অনেক ভাল থাকুক।

বিডি২৪লাইভ/এজে

সর্বশেষ

এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বিডি২৪লাইভ মিডিয়া (প্রাঃ) লিঃ, বাড়ি # ৩৫/১০, রোড # ১১, শেখেরটেক, মোহাম্মদপুর, ঢাকা - ১২০৭, 
ই-মেইলঃ info@bd24live.com, 
ফোন: ০২-৫৮১৫৭৭৪৪

বার্তা প্রধান: ০৯৬১১৬৭৭১৯০
নিউজ রুম: ০৯৬১১৬৭৭১৯১
মফস্বল ডেস্ক: ০১৫৫২৫৯২৫০২
ই: office.bd24live@gmail.com

Site Developed & Maintaned by: Primex Systems