ঢাকা, শনিবার, ২৫ মে, ২০১৯

বিধ্বংসী আগুন আমাদের পিছু ছাড়ছে না!

৩০ মার্চ, ২০১৯ ২১:৫৮:০০

রাজধানী ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সেই দগদগে ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই ফের বনানীর এফ আর টাওয়ারের বিধ্বংসী আগুনের বলি হলো নিরীহ ২৫ প্রাণ, চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ৭৩ জন। এমন ভয়াবহ বেদনা-বিধুর চিত্র নির্বাক চোখে শুধু তাকিয়ে দেখা ছাড়া যেন আমাদের আর করার কিছুই ছিল না। বুকের মাঝে চাপা আর্তনাদ ও গোটা দেশবাসীর মনজুড়ে আজ যেন দগদগে ঘা বিদ্যমান।

একটা ভয়াবহ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আবার আরেকটি ঘটনার নিদারুণ শিকলে আমরা বন্দি হচ্ছি বার বার। সম্প্রতি চকবাজার ট্রাজেডি, চট্টগ্রাম, মিরপুর-১৪ এর ভাসানটেক, রাজধানীর গুলশান-১ এর ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজার ও বনানীর এফ আর টাওয়ারের এই আগুনের ভয়ঙ্কর থাবা নিভিয়ে দিয়েছে তরতাজা প্রাণ আর ধ্বংস করেছে কোটি টাকার সম্পদ।

বনানীর আগুনে আটকে পড়া মানুষের বেঁচে থাকার সেকি করুণ আকুতি, আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছি ও শুনেছি ‘বাঁচাও বাঁচাও’। ওদের আর্তনাদ আমাদেরকে তাড়া করছে বার বার, মনে হচ্ছে আমাদের সর্বাঙ্গে আজ আগুন লেগেছে। প্রিয় মাতৃভূমির বাতাস এখন প্রচন্ড ভারী হয়ে উঠেছে। স্বজন হারানোর চিৎকার ধ্বনিতে প্রকম্পিত চারিধার, সারাদেশের মানুষ শোকে কাতর। আর কত অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু? আর কত আপনজন হারানোর যাতনা বহন করতে হবে আমাদের? চকবাজার, বনানী থেকে গুলশান, এখন আবার আগুনের গতি পথ কোন দিকে? সবকিছু ভাবতেই যেন বুকের পাজর দুমড়ে মুছড়ে ব্যাথাগুলো একাকার করছে হৃদয়ের দেয়ালে। একটু ভালো থাকার জন্য জীবিকার তাগিদে রাজধানীতে আসা ২৫ জন অভাগা মানুষ আর কোনোদিন স্বজনের কাছে ফিরবে না, কি নিষ্ঠুর নিয়তি! এই শহরের কর্মজীবি মানুষদের বেঁচে থাকা বড় বিস্ময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনিরাপদ ভেবেই জীবন সংগ্রামে যুদ্ধ করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত এই শহরে।

হঠাৎ এত আগুন কেন এই শহরে? আগুন থেকে মুক্তি পাচ্ছে না কেন আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ? আগুনের এই পোড়া লাশের মিছিল আর কত দীর্ঘতর হবে? একটি ঘটনা ঘটার পরেই আমাদের হুশগুলো বোধ হয় জেগে উঠে, কিছু দিন যেতে না যেতেই আবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। ঘুমকাতুরে চোখে কেবল দায়সারা কর্মের উপস্থিতি। আবার মহা লালসায় মিথ্যার মোড়কে থাকা বিষয়গুলোকে সত্যতার মহা সার্টিফিকেট দিয়ে থাকিও আমরা, কি অদ্ভুদ বাংলাদেশ! ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে ওঠা এই শহরের ভবন গুলো কতটা নিরাপদ? কতগুলো ভবনে আছে অগ্নি নিরাপত্তা? বহুতল ভবনে হাইড্রোলিক পাম্প আছে কি? রাজউকের বিল্ডিং কোর্ড মেনে কয়টি বিল্ডিং গড়ে উঠেছে? জানি এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ও শোনার কেউ নেই, আমাদের প্রশ্নগুলো আজ অবান্তর। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ভবন নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু আর হাজার টাকা খরচ করে অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে পারে না, এই হলো আমাদের পরিস্থিতি। উন্নত দেশে আমরা দেখেছি এসব উঁচুতলা ভবনগুলোতে অটো ফারার সার্ভিস থাকে, না হয় বিল্ডিং পাস দেই না সরকার।

বড় ব্যথাতুর হৃদয়ে বলতে হয় স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও আমরা সব সেক্টরের সিস্টেম ডেভেলপ করতে পারেনি, সিস্টেমের বেড়াজালে দেশকে আটকে রেখেছি। মহাকাশে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট দিতে পেরেছি আমরা, কিন্তু কি নিয়তি আমাদের দীর্ঘ উচু তলায় যাওয়ার মত ক্রেন লেডার (যন্ত্রচালিত মই) নেই। বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগার সাড়ে ৩ ঘণ্টা পরে সর্বোচ্চ ক্রেন লেডার সেটি আনতে সক্ষম হয়েছি আমরা। কি করুণ বাস্তবতা আমাদের। দেশবাসী দেখেছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের। অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিট কাজ করলেও পানির সংকটের কারণে আগুন নেভানোর কাজ ব্যাহত হয়েছে।

সম্প্রতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি ঢাকা ওয়াসাকে আগুন নেভানোর কাজে পানির প্রাপ্যতা সহজ করতে রাজধানীতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফায়ার হাইড্রেন্ট (অগ্নিনির্বাপণ কাজে ব্যবহৃত বিশেষ পানিকল) স্থাপন করার জন্য ব্যবস্থা নিতে বলেছে।

আমাদের অগ্নিকাণ্ডের ইতিহাস কম নয়। যার হিসাবের অঙ্ক দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। সেই নিমতলী ট্র্যাজেডি, তাজরিন ফ্যাশন ট্র্যাজেডি, চকবাজার ট্র্যাজেডি ও বনানী ট্র্যাজেডি। আর কত ট্র্যাজেডি সইতে হবে আমাদের? ফায়ার সার্ভিসের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ৮৮ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রাণহানি হয়েছে ১৪০০ জন, আহত হয়েছে অন্তত ৫০০০ মানুষ।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালেই সারা দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ১৯ হাজার ৬৪২টি। এতে নিহত হন ১৩ জন, আহত হয়েছেন ৬৬৪ জন। ২০১৭ সালে ১৮ হাজার ১০৫টি অগ্নিকাণ্ড ঘটে, এতে নিহত হন ৪৫ জন, আহত হন ২৬৯ জন, ২০১৬ সালে ১৬ হাজার ৮৫৮টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এতে নিহত হন ৫২ জন, আহত হন ২৪৭, ২০১৫ সালে ১৭ হাজার ৪৮৮টি অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬৮ জন, ২১৬ জন, ২০১৪ সালে ১৭ হাজার ৮৩০টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহত হন ৭০ আর আহত হয়েছিলেন ২১০ জন। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ৭৮ হাজার ৯৫টি, নিহত হয়েছেন ১১২৫ জন, আহত হয়েছিলেন ৫ হাজার ৩৩৫ জন, ২০০৪ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নিহত হন ৪৮০ জন এবং আহত হয়েছিলেন ৩ হাজার ৬৮৪ জন।

হিসাবের ডায়েরি যতই দীর্ঘ হোক না কেন আমাদের বিবেক জাগে না। আমরা দায়িত্বের জায়গাগুলি দায়িত্বজ্ঞান হারিয়ে বন্ধ্যাত্ব রোগ ধারণ করেছে। শুধু সরকারকে দায়ি করে লাভ নেই, সরকারের পক্ষে সবকিছু বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ব্যক্তি থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও দায়িত্ব রয়েছে সবার। দেশকে রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের সঙ্গে সঙ্গে সবারই। আমাদের দেশের রাস্তাঘাট এবং বিল্ডিংগুলো সুচিন্তিতভাবে করলে অগ্নিকাণ্ড ঘটলেও হয়তো এত প্রাণহানি হতো না। ফায়ার সার্ভিস সহজে ঢুকতে পারলে দ্রুততার সাথে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতো। আর অসচেতন নয় এখনই সময় এসেছে আমাদের সতর্ক এবং সচেতন হওয়ার।

আমরা চাই না এ রকমের বেদনা বিধুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি, চাই না এ নিষ্ঠুর প্রাণহানি। চাই সু-পরিকল্পিত বাসযোগ্য শহর, দূর হোক অব্যবস্থাপনায় গড়ে উঠা সকল ভবন। কঠোর হস্তে দমনের মধ্যে দিয়ে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সরকার এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।

লেখক: এস.এম. হাফিজুর রহমান

চেয়ারম্যান, অক্সফোর্ড স্কুল এন্ড কলেজ ও নিসু ফাউন্ডেশন।

বিডি২৪লাইভ/টিএএফ

সর্বশেষ

এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বিডি২৪লাইভ মিডিয়া (প্রাঃ) লিঃ, বাড়ি # ৩৫/১০, রোড # ১১, শেখেরটেক, মোহাম্মদপুর, ঢাকা - ১২০৭, 
ই-মেইলঃ info@bd24live.com, 
ফোন: ০২-৫৮১৫৭৭৪৪

বার্তা প্রধান: ০৯৬১১৬৭৭১৯০
নিউজ রুম: ০৯৬১১৬৭৭১৯১
মফস্বল ডেস্ক: ০১৫৫২৫৯২৫০২
ই: office.bd24live@gmail.com

Site Developed & Maintaned by: Primex Systems