বারকী শ্রমিক থেকে কোটিপতি, কারাগারে আলিম

১৯ নভেম্বর ২০১৯, ১২:৪৪:৫৯

ওয়েছ খছরু: শেষ রক্ষা হলো না ‘জাফলং খাদক’ আলিম উদ্দিনের। অপকর্মের সহযোগী ভাই শাহজাহানকে সঙ্গে নিয়ে কারান্তরীণ হতে হলো তাকে। জাফলং নয়াবস্তির যুবক সালামকে প্রকাশ্যে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয়ার ঘটনায় আলিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। আলোচিত ঘটনার আসামি হলেও প্রায় ২০ দিন নিজ এলাকায় প্রকাশ্যে ছিল সে। পরে ৫ই নভেম্বর উচ্চ আদালত থেকে দুই সপ্তাহের জামিন নেয়। গতকাল সিলেটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হারুনুর রশীদের আদালতে ভাই সহ হাজির হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ সময় কাঁধে বহন করে আদালতে তোলা হয় আলিম উদ্দিনের নির্যাতনের শিকার হাত-পা ভাঙা সালাম মিয়াকে। জামিন শুনানিকালে আদালত সালামের ওপর ঘটে যাওয়া নির্মমতার বিবরণ তুলে ধরেন আইনজীবীরা।

বাদীপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট রতন মনি চন্দ্র মানবজমিনকে জানিয়েছেন- আদালত জামিন শুনানিকালে আলিম উদ্দিন ও শাহজাহানের জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। অপর চার আসামিকে জামিন দিয়েছেন বলে জানান তিনি। এ নিয়ে আলোচিত এ মামলায় তিনজন কারান্তরীণ হলেন। সিলেটের জাফলংয়ের সর্বশেষ ‘খাদক’ আলিম উদ্দিন। তার নেতৃত্বে গত ৫ বছর ধরে জাফলংয়ে অবাধে লুটপাট করা হয়। এতে প্রায় শতকোটি টাকার পাথর লুটপাট হয়েছে। পাথর লুটপাটের ঘটনায় স্থানীয় মামার দোকানে পিটিয়ে হত্যা করা হয় সালেক ড্রাইভারকে। এ ঘটনায় আলিমউদ্দিন আসামি না হলে গ্রেপ্তার হওয়া তার ভাই শাহজাহান ছিল মূল হোতা। সিলেট ট্রাক শ্রমিক সমিতির সভাপতি ফয়েজুদ্দিন খান জানিয়েছেন- অবাধে পাথর উত্তোলন করে মার্কেট ঝুঁকির মুখে ফেলার কারণে প্রতিবাদ জানিয়েছিলো ট্রাকচালক সালেক।

আর প্রতিবাদ করার কারণেই তাকে মামার দোকানে প্রকাশ্য রড দিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে খুন করা হয়। জাফলংয়ের বাসিন্দারা জানিয়েছেন- আলিম উদ্দিন তার ভাইরা ৫ বছর আগেও এতো সম্পত্তির মালিক ছিলো না। আলিম উদ্দিন ছিলো বারকি শ্রমিক। নয়াবস্তির বাসিন্দা হওয়ার গ্রামের ওপারে জাফলং চা বাগান এলাকার লুটপাট করা পাথর সে নৌকা দিয়ে বহন করতো। তখন বারকী শ্রমিক হিসেবেই আলিম উদ্দিন পরিচিত ছিল। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে সে এখন কোটিপতি। তার অঢেল সম্পত্তি। ভাইদের নামেও গড়ে তুলেছে সম্পদের পাহাড়। আর এসব হয়েছে জাফলংয়ের খাদক হওয়ার কারণে। পরিবারে ভাইদের সংখ্যা বেশি। আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যাও কম নয়। এ কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগে প্রভাবশালীদের শেল্টার পড়ে তার উপর। থানা পুলিশও এসে যায় হাতের মুঠোয়। এরপর থেকে শুরু হয় রাজত্ব। এই রাজত্বে সে প্রথমে সহযোগী ছিলো জাফলংয়ের আরেক খাদক ছাতকের আলাউদ্দিনের। কিন্তু পরবর্তীতে আলাউদ্দিনের সঙ্গেও লুটপাট নিয়ে দূরত্বের সৃষ্টি হয়।

এরপর থেকে স্থানীয় হওয়ার কারণে আলিম উদ্দিনই হয়ে ওঠে মূল নিয়ন্ত্রক। এখন আলিম উদ্দিন ও তার ভাইরা প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয় করে নিজেদের গ্রামে তিনটি আলাদা বাড়ি তৈরি করছে। এর মধ্যে আলিম উদ্দিনের বাড়ির কাজ শেষ হয়েছে। অপর দু’টি বাড়ি তৈরির কাজ চলছে। নিজের নামে জাফলংয়ে অনেক জমি কিনেছেন আলিম উদ্দিন। তিনি গত বছর স্থানীয় লক্ষ্মীপুর গোরস্থানের কাছে তোফাজ্জুলের কাছে থেকে ২৫ শতক জমি ক্রয় করেছেন। দলিলে এই জমির মূল্য ৭৫ লাখ টাকা দেখানো হলে মালিককে দেয়া হয়েছে দেড় কোটি টাকা। পূর্বের মালিকপক্ষ সূত্র জানিয়েছে- আলিমউদ্দিন নিজের নামেই ওই ভূমি ক্রয় করেন। এবং টাকা পরিশোধ করেন তিনি। পরে তিনি জাফলং বল্লাঘাটের পুঞ্জিতে উডি খাসিয়ার কাছ থেকে কোটি টাকা দিয়ে ৬১ শতক জমি ক্রয় করেছেন। এখনো দলিল রেজিস্ট্রি না হলেও স্ট্যাম্পে দস্তগত করে রেখেছেন। ক্রাশার মিল স্থাপন করতে এই জমি ক্রয় করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তানিশা স্টোর ক্রাশার মিল রয়েছে তার।

প্রায় কোটি টাকার পাথর তার স্টোন ক্রাশার মিলে স্টক করা রয়েছে। ক্রাশার মিল এলাকার এক নম্বর সারিতে অবস্থিত ওই ক্রাশার মিলের মূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। দেড় বছর আগে অন্য এক মালিকের কাছ থেকে আলিম উদ্দিন ওই স্টোন ক্রাশার মিল ক্রয় করে। জাফলং এলাকার যন্ত্রদানব তিনটি বোমা মেশিনের মালিক আলিম উদ্দিন। এই বোমা মেশিনের মূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা। ওই বোমা মেশিন দিয়ে সে গত চার বছর ধরে পাথর লুটপাট করছে জাফলংয়ে। জাফলং নয়াবস্তি গ্রামের বাসিন্দা আলমাছ উদ্দিনসহ কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন- জাফলং কোয়ারি সংরক্ষিত এলাকা হওয়ার পর পাথরখেকো আলিম উদ্দিন ও তার সহযোগীরা জুম মন্দির এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটারজুড়ে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর লুটপাট চালিয়েছে। তারা গত চারবছরে প্রায় ৫০ কোটি টাকার পাথর লুট করেছে। এসব পাথর তুলতে গিয়ে অন্তত ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও অদৃশ্য কারণে আলিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। এদিকে- জাফলং জুম মন্দির এলাকা ছাড়াও চা বাগান এলাকায় অবাধে পাথর লুটপাট চালানো হয়েছে। সংরক্ষিত বাগান ভেঙে পাথর লুট করা হলেও প্রশাসন ছিল নির্বিকার। প্রায় এক মাস আগ পর্যন্ত আলিম উদ্দিনের নেতৃত্বে চা বাগান এলাকায় প্রতিদিন ৫০-৬০টি সেভ ও বিলাই মেশিন দিয়ে পাথর লুটপাট করা হতো। ওখান থেকে তারা প্রতিদিন ৩-৪ লাখ টাকার চাঁদা আদায় করতো।

জাফলং ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন শত শত নৌকা দিয়ে বালু লুটপাট করা হতো। নির্ধারিত বালু মহাল না থাকলেও আলিম উদ্দিন তার সহযোগীরা এসব নৌকায় বালু উত্তোলনে শেল্টার দিতো। স্থানীয়রা এ নিয়ে প্রশাসনে দিলেও কোনো কাজ হয়নি। মামার দোকানের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন- পিয়াইন নদীর বালুর নৌকা থেকে প্রতিদিন ২-৩ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হতো। আর এসব চাঁদা তুলতো আলিম উদ্দিন ও তার সহযোগীরা। মামার দোকানই তাদের মূল আস্তানা। ওখানে বসে সে সব নিয়ন্ত্রণ করতো। তার বাহিনীর মধ্যে নিজের ভাইরা ছাড়াও বিশ্বনাথের ফয়জুল, ছমেদ, শাহীন, ইউনূস, করিম এসব নৌকা থেকে চাঁদা আদায় করতো। গত ১৭ই অক্টোবর পাথর লুটপাটকালে নদীতে পুঁতে ফেলা জাল ছিঁড়ে ফেলেছিল আলিম উদ্দিনের শ্যালো নৌকা। আর এ ঘটনার প্রতিবাদ করায় সালামকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেলা হয়। দ্বিতীয় দফা হামলা চালিয়ে সালামের ভাই আলমাছ, মামা ভেলু মিয়া, সালামের পিতা শহীদ মিয়াকে গুরুতর আহত করে। মামলার বাদী কুঠিন মিয়া জানিয়েছেন- আলিম উদ্দিন গ্রেপ্তার হওয়ায় জাফলংয়ে স্বস্তি ফিরেছে। তারা পুরো জাফলংয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তাদের ভয়ে তটস্থ থাকে সব মানুষ। যারাই তার অপকর্মের প্রতিবাদ করেছে তারাই হয়েছে হামলার শিকার। কারো কারো প্রাণও চলে গেছে। সূত্র: মানবজমিন।

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।