লবণের কেজি ৩ টাকা, উৎপাদন খরচ ৬ টাকা

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ৮:৪০:১৬

দেশের প্রধান লবণ উৎপাদন কেন্দ্র কক্সবাজারের মাঠে আকস্মিক লবণের দাম এযাবৎকালের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। কক্সবাজারের কতুবদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপের মাঠ পর্যায়ে প্রতি মণ উৎপাদিত লবণের দাম ছিল মাত্র ১৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি লবণের দাম মাত্র ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। অথচ প্রতি কেজি লবণ উৎপাদনে চাষিদের খরচ হয় ৬ টাকা ২৫ পয়সা। মাত্র এক সপ্তাহে দাম উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। গেল সপ্তাহেও ছিল মণ প্রতি ১৮০ টাকা। লবণের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় কক্সবাজার উপকূলের ৬০ হাজার লবণ চাষির ঘরে রীতিমত আহাজারি শুরু হয়েছে। একর প্রতি এক মৌসুমের জন্য ৭৫ হাজার টাকায় বর্গা জমি নিয়ে এবার সেই টাকাও তুলতে পারবে না- চাষিরা এমন আশঙ্কায় রয়েছেন। গেল বছর বাম্পার লবণ উৎপাদন হয়েছিল। এমনকি বিগত ৫০ বছরের উৎপাদন রেকর্ড ভঙ্গ করে ১৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন লবণ। চাহিদা ছিল ১৮ লাখ মেট্রিক টন। তদুপরি দামও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু এবার মৌসুমের মধ্যভাগে এসে লবণের দাম অস্বাভাবিক ভাবে পড়ে যাওয়ায় হতাশ চাষিরা মাঠ থেকে উঠে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন বলেন, ‘উপকুলের লবণ চাষিরা উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মানববন্ধনসহ নানাভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। আমি লবণ পরিস্থিতির বিস্তারিত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। সেই সাথে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির ব্যাপারে আশ্বস্থ করে চাষিদের যথারীতি উৎপাদনে মনোযোগী হতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। মহেশখালী উপজেলার নলবিলা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হক জানান, বিগত ৪০ বছর ধরে তিনি লবণ চাষের সাথে জড়িত। লবণের উৎপাদন এখনো আশানূরুপ হচ্ছে না। এ পর্যন্ত তার জমিতে একর প্রতি লবণ উৎপাদিত হয়েছে ৫০ মণ। অথচ গতবছর এসময়ে উৎপাদন হয়েছিল একশত মন।

তিনি জানান, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানায় তিনি প্রতিমাসে লবণ সরবরাহ করতেন। বিভিন্ন শিল্প কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী তিনি লবণ জোগান দিতেন। গত ৩/৪ বছর ধরে ওই সব কারখানার মালিক তার কাছ থেকে লবণ কিনছেন না। কারণ তারা আমদানিকারকদের কাছ থেকেই লবণ কিনছেন। কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের আমান উল্লাহ নামের একজন লবণ চাষি জানান, আমরা ১৭ জন চাষি মিলে যৌথভাবে ১০০ কানি (৪০ একর) জমিতে লবণ চাষ করছি। একর প্রতি খরচের হিসাব হচ্ছে, একজন মজুর ৬ মাসের জন্য ৬০ হাজার টাকা, জমির বর্গা বাবদ ৭৫ হাজার টাকা, পলিথিন ও পানির খরচ ৩০ হাজার টাকাসহ মোট খরচ হয় এক লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

তিনি বলেন, অথচ একর প্রতি উৎপাদিত ৬৭৫ মণ লবণ বিক্রি (প্রতি মণে ১৫০ টাকা) করে পাওয়া যাবে এক লাখ ১৪ হাজার টাকা। চাষিরা এভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে চাষ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ লবণ চাষি বাঁচাও পরিষদের আহ্বায়ক সাজেদুল করিম বলেন, আমি আমার পারিবারিক ১০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করে আসছি বছরের পর বছর ধরে। গেল বছরের মৌসুমে একর প্রতি এক হাজার মণ লবণও উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই উৎপাদন নেমে গেছে অনেক নিচে। লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলেও মজুরের দামসহ অন্যান্য কোনো কিছুরই দাম কমেনি।

বাংলাদেশ লবণ চাষি কল্যাণ পরিষদের সভাপতি মোস্তফা কামাল চৌধুরীর অভিযোগ, সিন্ডিকেট করে বন্ডেড ওয়্যার হাউজ এর আওতায় ব্যাক টু ব্যাক এলসি এবং ট্যাক্স ফাঁকির মাধ্যমে ক্যামিকেল আইটেমের আড়ালে সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড (খাবার লবণ) আমদানি করা হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় লবণের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে দেশীয় লবণ চাষিরা ন্যায্য মূল্য বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পন্থায় অবৈধভাবে লবণ আমদানি করায় সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব। লবণের মাঠ পর্যায়ে চাষিরা তাদের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে এখন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।

মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক সোমবার জানান, ইতিমধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে কক্সবাজারের লবণ চাষিদের আহাজারির কথা জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি বন্ধ করা না গেলে দেশীয় শিল্পটির উপর মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় এমপি আশেক উল্লাহ রফিকসহ আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে লবণের বাস্তবচিত্র তুলে ধরেছি। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছি-কিছু অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর কারণেই দেশীয় লবণ শিল্পে অরাজকতা দেখা দিয়েছে।

অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা জানান, প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য ধৈর্য্য সহকারে শুনে বলেছেন, তিনি লবণ চাষিদের যাবতীয় সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, লবণ চাষিদের স্বার্থ সংরক্ষণসহ লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে। এমনকি লবণ চাষিদের আশ্বস্ত করে যথারীতি উৎপাদনের কাজে লেগে থাকার তাগিদও দিয়েছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে বিসিক কক্সবাজারের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মোঃ হাফিজুর রহমান বলেন, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণ মাত্র উৎপাদিত হয়েছে। অথচ গেল বছর এ সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন লবণ। গেল বছর ৬০ হাজার একর জমিতে লবণের চাষ হয়েছিল কিন্তু এবার চাষের জমি অনেক পরিমাণে কমে যাবে। তিনি জানান, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মাঠ জরিপ শুরু করা হবে।

অপর দিকে, দেশীয় স্বয়ংসম্পন্ন লবণ শিল্প বাঁচাতে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবনা দিয়েছে লবণ মিল মালিক সমিতি। নেতৃবৃন্দের মতে, মন্ত্রণালয় বা অন্য সরকারি সংস্থার আওতায় নিবন্ধিত করে মধ্যস্বত্তভোগীদের কমিশন নির্দিষ্ট করে দেয়া দরকার। মৌসুমের শুরুতে লবণ চাষিদের সরকারিভাবে পলিথিন সরবরাহ করা হোক। লবণ মৌসুমের শুরুতে বিশেষ উৎসাহ-সহায়তা হিসেবে চাল বরাদ্দ করতে হবে। যাতে অভাবের তাড়নায় মধ্যস্বত্তভোগীদের কবল মুক্ত হয় তারা। তাদের মতে, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনে প্রচুর জমি অধিগ্রহণ করায় লবণ চাষের মূল জমির পরিমাণ কমে এসেছে। বেকার হয়ে গেছে চাষিরা। বিভিন্ন উপকূল সংলগ্ন নতুন করে জেগে ওঠা চরের জমি সত্যিকার লবণ মিলার ও লবণ চাষিদেরকে সহজ শর্তে বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করলে উক্ত জমিগুলো লবণ চাষের উপযোগী করে লবণ চাষের আওতা বৃদ্ধি করা যায়।

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।