‘আর্মির অবসরপ্রাপ্ত? তাইলে এতো ডরের কি আছে?’

৯ আগস্ট ২০২০, ১:৪৬:২৩

মেজর (অব:) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলায় টেকনাফ থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই লিয়াকত ও এএসআই নন্দ দুলাল রক্ষিতের সাত দিনের রিমান্ড এবং অন্য চার আসামিকে জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এদিকে জানা গেছে, নৃশংসভাবে খুনের পর ঘটনা ধামাচাপা দিতে সব ধরনের চেষ্টা করেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ। ভবিষ্যতে সিনহার পরিবার মামলা করেও যাতে তেমন সুবিধা করতে না পারে সে জন্য নিজেই এই ঘটনায় আরো একটি মামলা করতে চেয়েছিলেন। আর তাকে এই মামলা রুজু করার পরামর্শ দেন তারই সুবিধাভোগী সাবেক এক পুলিশ সুপার।

সিনহাকে খুনের পরে ঈদের দিন সকালে এ বিষয়ে সাবেক ওই পুলিশ কর্মকর্তার কাছে ফোন করে সাহায্য চান প্রদীপ। তাদের সেই ফোনালাপ ফাঁস হয়ে গেছে। সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তাকে খুন কর তার দায় থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য তার কাছ থেকে আইনি পরামর্শ নেন ওসি প্রদীপ কুমার। পরামর্শদাতা এই ব্যাক্তি কে তার প্রকাশ না পেলেও কন্ঠস্বর শুনে গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের অনেকে এ অজ্ঞাত ব্যাক্তিকে পুলিশের এক সাবেক এসপি বলে চিহ্নিত করে অনুসন্ধান শুরু করেছে। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়ায় বলেও জানা গেছে। এই কথোপকথনে সুস্পষ্ট, ভ্রমণ ভিত্তিক ভিডিও ডকুমেন্টারি তৈরি করতে গেলে ঠাণ্ডা মাথায় সিনহাকে হত্যা করা হয় এবং পুলিশের দায়েরকৃত মামলা সম্পূর্ণ মিথ্যার উপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভাইরাল ওসি প্রদীপ ও আইনি পরামর্শদাতার কথোকথন :

পরামর্শদাতা: হ্যালো

ওসি প্রদীপ: স্যার আদাব স্যার

পরামর্শদাতা: হ্যা

ওসি প্রদীপ: স্যার আমি ওসি টেকনাফ প্রদীপ, স্যার

পরামর্শদাতা: হ্যা কি খবর প্রদীপ কোরবানির গরুর মধ্যে কি

ওসি প্রদীপ: স্যার একটা মহাবিপদে পড়ছি, আপনার সাহায্য দরকার

পরামর্শদাতা: বলো বলো

ওসি প্রদীপ: এখন আমরা স্যার একটা ১৫৩, ১৮৬ ও ৩০৭ এ মামলা নিছি স্যার

পরামর্শদাতা: ওয়ান ফিফটি থ্রি

ওসি প্রদীপ: স্যার থ্রি ফিফটি থ্রি

পরামর্শদাতা: থ্রি ফিফটি থ্রি সরকারি কর্মচারি আরেকটা হচ্ছে

ওসি প্রদীপ: আরেকটা হচ্ছে ১৮৬ পুলিশের কাজে বাধা

পরামর্শদাতা: আর্মিদেরকে ইন্টিমেশন দিছ কিনা?

ওসি প্রদীপ: এরপরে স্যার জানাইছি, আর্মি থেকে লোকজন আসছে

পরামর্শদাতা: এ কি আর্মির নাকি?

ওসি প্রদীপ: স্যার অবসরপ্রাপ্ত

পরামর্শদাতা: ও তাইলে এতো ডরের কি আছে?

ওসি প্রদীপ: এখন স্যার ও মারা গেছে, ইনজিওরড অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেছে।

পরামর্শদাতা: এর সঙ্গে যে লোকটা ছিল ওইটা কি?

ওসি প্রদীপ: ওইটা স্যার একটা ছাত্র, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির। সে বলছে যে আমরা রাতের বেলা পাহাড়ের সিন নেয়ার জন্য.. ওরা নাকি স্যার ইউটিউবের একটা চ্যানেল করার জন্য আসছে ভ্রমণের উপরে।

পরামর্শদাতা: তোমরা তো অবস্ট্রাকশন দিছ, অবস্ট্রাকশন ভায়োলেট কইরা গেছে, গাড়ি চালাইছে।

গাড়িওয়ালারে এরেস্ট করছ কিনা?

ওসি প্রদীপ: স্যার গাড়িচালক তো ও নিজেই।

পরামর্শদাতা: ও আচ্ছা আচ্ছা, গাড়ি জব্দ করছ কিনা?

ওসি প্রদীপ: জি স্যার করছি।

পরামর্শদাতা: আচ্ছা তোমরা যে বাধা দিছ, ওভারটেক কইরা গেছে, এইটার সাক্ষী আছে কিনা পাবলিক?

ওসি প্রদীপ: সাক্ষী আছে স্যার।

পরামর্শদাতা: সাক্ষী থাকলে মামলা কী নিছ বলো।

ওসি প্রদীপ: মামলা নিছি স্যার ১৮৬, ৩৫৩, ৩০৭।

পরামর্শদাতা: প্রেয়ার দিয়া দিবা যে একটা মার্ডার হইয়া গেছে।

ওসি প্রদীপ: আর আলাদা কোন কেস দিতে হবে না স্যার?

পরামর্শদাতা: আরেকটা কেস কি নিবা?

ওসি প্রদীপ: আরেকটা কেস আমরা কী নিবো? ও যে সদর হাসপাতালে মারা গেছে স্যার। সদর হাসপাতালের বিষয়ে একটা ইউডি কেস নিয়ে নিবো স্যার?

পরামর্শদাতা: আমার তো মনে হয় সদর থানারে দিয়া একটা ইউডি কেস করাই রাখ।

ওসি প্রদীপ: ভালো হবে, না স্যার?

পরামর্শদাতা: আমার মনে হয় ভালো হয়। আর্মির লোক তো পরে টানাটানি করে কিনা! আর নাইলে তো…

ওসি প্রদীপ: নাহলে তো স্যার ওরা স্যার লাশ নিয়ে গেলে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে যে কোন সময়। আমরা একটা মামলা করে ফেললে ওই মামলাটা ট্যাগ করা যাবে।
পরামর্শদাতা: তাহলে তোমরা একটা কাজ করো না, ৩০৪ এও একটা মামলা নিয়া নিতে পারো।

ওসি প্রদীপ: ৩০৪ এ আমরা কি লিখবো স্যার?

পরামর্শদাতা: লেখবা যে ইয়ার মধ্যে ইয়া হইছিল। আসামি হাউএভার মারা গেছে। এ কারণে মামলাটা রুজু করা হইল। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হোক।

ওসি প্রদীপ: স্যার ৩০৭ এ এখানে আসামীর কলামে কি লিখবো?

পরামর্শদাতা: না আরেকটা সেপারেট মামলার জন্য বলছি। যেহেতু আসামি মারা গেছে তাই এ মৃত্যুর জন্য মামলা করা হলো।

ওসি প্রদীপ: স্যার মামলা নিবো যে আসামীর কলামে নাম লিখতে হবে না?

পরামর্শদাতা: পুলিশে গুলি করছিলো, বুজছি তো। এই এজাহারটা পুরা লিখবা, যে এই এই কারণে তাকে অবস্ট্রাকশন করে আটকানো হইছিলো। আটকানো হওয়ার পরে এই মামলা রজু হইছে। হাসপাতালে পাঠানোর পরে সেখানে সে মারা গেছে। যেহেতু মানুষ মারা গেছে তাই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যব্স্থা নেয়ার জন্য মামলা রজু করা হলো, ৩০৪ এ।

ওসি প্রদীপ: আসামী অজ্ঞাত।

পরামর্শদাতা: এইটা নিয়া রাখ। তাহলে এরা কোর্টে কেইস করলে এইটা ট্যাগ হইয়া যাবে।

ওসি প্রদীপ: স্যার ৩০৪ আমি নিবো নাকি সেখানে ডিউটি অফিসার দিয়ে নিয়ে রাখব সদর থানা দিয়ে?

পরামর্শদাতা: সদর থানায় লইবো নাকি তোমার মামলা?

ওসি প্রদীপ: সবকিছু লেখার পরে লেখবো যে সদর থানার মধ্যে মারা গেছে স্যার।

পরামর্শদাতা: হ্যা, হ্যা। তোমার এজাহারটা হুবহু লেইখা যাইবা, যে এই এই মামলার আসামী তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে পাঠানো হইয়াছিল। যেহেতু আসামি মারা গেছে হাসপাতালে, সেহেতু সে মারা গেছে হত্যা মামলা রুজু করা হলো। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হোক। এই বর্ণনা হুবহু লেখবা।

ওসি প্রদীপ: সবকিছু লিখে লাস্টে এটা লিখবো।

পরামর্শদাতা: যেহেতু মারা গেছে এসব ঘটনার কারণে ৩০৪ এ হত্যা মামলা রজু করা হলো। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হোক।

ওসি প্রদীপ: ঠিক আছে স্যার, আসসালামু আলাইকুম।

পরামর্শদাতা: থ্যাংক ইউ

উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই রাতে শামলাপুরের পাহাড়ি এলাকা থেকে শুটিংয়ের কাজ শেষে ফেরার পথে তল্লাশির সময় পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর সিনহা। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এখন পুলিশের হেফাজতে আছেন প্রদীপ কুমারসহ ৯ আসামি।

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।