ছবি তোলা নিয়ে আপত্তি, ঢাবিতে অফিস কক্ষে কলেজছাত্রীকে হেনস্তা

৩০ জুলাই ২০২২, ১১:৪০:৪৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ফটোশুটে গিয়ে হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন কলেজপড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী। তাদের একজন ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র। অন্যজন ঢাকা সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। এসময় তাদের দুজনের সঙ্গে থাকা এক তরুণকেও হেনস্তা করা হয়। গত মঙ্গলবার (২৬ এপ্রিল) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. একেএম মাহবুব হাসানের অফিস কক্ষে এ ঘটনা ঘটে।

হেনস্তার শিকার ছাত্রের দেওয়া অভিযোগ সুত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন বেলা ১২ টায় তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে পৌছান মেয়েটির কিছু ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। এসময় মেয়েটির পরণে ছিল স্লিভলেস (হাতা-কাটা) ব্লাউজ ও শাড়ি। ছবি তোলার একপর্যায়ে সেখানে হাজির হন জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহবুব হাসান। তিনি ওই দুই শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চান, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিনা। এরপর যখন তিনি জানতে পারলেন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন, তখন তাদেরকে নিজ অফিস কক্ষে ডেকে নেন।

অফিস কক্ষে প্রবেশের পর একজন ম্যাডাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এরকম ছবি তোলার সাহস তোমরা কি করে পেলে। তোমরা কি জানো এটা পর্নোগ্রাফি আইনের মধ্যে পড়ে?’ এরপর তিনি ওই দুই শিক্ষার্খীর অভিভাবকের নম্বর সংগ্রহ করেন এবং তাদেরকে ফোন দিয়ে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে বলেন।

ওই ছাত্র অভিযোগ করে বলেন, ঠিক তখন থেকেই ম্যাডাম আমাদের সঙ্গে বেশ বাজে আচারন শুরু করলেন। আমার আম্মুকে ফোন দিয়ে বললেন, ‘আপনি কি হাউস ওয়াইফ নাকি চাকরি করেন? আপনার ছেলে কোথায় কি করছে তা কি আপনি জানেন না? আপনি জানেন আপনার ছেলে কি রকম ছবি তুলছিল? আপনার ছেলে জামা কাপড় ছাড়া ড্রেসলেস নুড মেয়ের ছবি তুলছিল।’ এসময় আমি তার এমন মন্তব্যর জবাব দিলে তিনি আরও ক্ষুব্ধ হন-যোগ করেন ওই ছাত্র।

ঘটনার একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজির হন ওই দুই শিক্ষার্থীর বাবা ও মা। বাজেয়াপ্ত করা হয় ওই ছাত্রের ক্যামেরা। এদিকে, তাদের দুজনের সঙ্গে থাকা ওই তরুণের কোনো অভিভাবক না আসায় তাকে প্রশাসনের কাছে তুলে দেওয়া হয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।

এ বিষয়ে বিডি২৪লাইভকে ওই কলেজছাত্রের মা বলেন, ‘মঙ্গলবার দুপুরে আমার ছেলের নম্বর থেকে একটি ফোনকল আসে। ওপাশ থেকে কেউ বলছিল- আপনি কি সিয়ামের মা? আমরা সিয়ামের বিষয়ে কথা বলতে চাই। আপনার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন মেয়ের ছবি তুলছিল, এমন ছবি তুলছিল যেখানে কাপড়ের ছিটেফোটা নেই। তাদের এমন অভিযোগের পরপরই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌছাই। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই মেয়েটির পরণে ছিল শাড়ি ও স্লিভলেস ব্লাউজ। তার পোশাকে অশালীন কোনো কিছুই চোখে পড়েনি। তাহলে কি করে এটাকে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে তুলনা করা হয়?’

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কয়েকবছর ধরেই ফটোগ্রাফির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সেদিনও তিনি ফটোশুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তাদেরকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, যে ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের থেকে এমনটা কখনো আশা করি না।’

সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে হেনস্তার শিকার ওই ছাত্রী বিডি২৪লাইভকে বলেন, ‘কার্জন হলে তো অনেকেই ছবি তুলে। তাই সে ভাবনা থেকে আমরাও সেখানে গিয়েছিলাম ছবি তুলতে। আমার পরণে ছিল শাড়ি ও স্লিভলেজ ব্লাউজ। সেখানে ছবি তুলতে থাকার একপর্যায়ে আমাদেরকে ডিন স্যারের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে বলা হয়, আমরা ন্যুড ফটোগ্রাফি করছিলাম। পর্নোগ্রাফি করছিলাম। একর্পায়ে ফটোগ্রাফার ছেলেটা সেই কথার জবাব দিলে তারা আরও ক্ষুব্ধ হন এবং দুর্ব্যবহার শুরু করেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের থেকে এমন আচারন হতাশাজনক ও কষ্টদায়ক জানিয়ে ওই ছাত্রী বলেন, ‘সাধারণ মেয়েদের মতোই আমি শাড়ি পড়েছিলাম। তারা আমার স্লিভলেস পোশাককে ড্রেসলেস পোশাক বলছিল, থানা-মামলার কথা বলছিল। পর্নের সঙ্গে তুলনা করছিল। আমার বাবা সেখানে উপস্থিত হওয়ার পরে তাকে জিজ্ঞেস করছিল, আমি কি ড্রাগস নেই কিনা? ড্রাগস নিলে নাকি এরকম ছবি তোলা যায় বলেও মন্তব্য করছিল।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. একেএম মাহবুব হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো অসৌজন্যমূলক আচারন করা হয়নি বলে দাবি করেন এই শিক্ষক।

স্লিভলেস পোষাক পড়া অন্যায় কিনা বা মেয়ের পোশাক নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল কিনা এমন প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি অধ্যাপক ড. মাহবুব হাসান। তাহলে কেনো তাদেরকে অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এমন প্রশ্নে তিনি বলেন,  ‘বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়াতে এমন কিছু করতে গেলে, অনুমতির প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া তাঁরা যেভাবে ছবি তুলছিল সেগুলো আমাদের পরিবেশের সঙ্গে যায় না। পরবর্তীতে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার এক পর্যায়ে জানতে পারি, তাঁরা পরস্পরের বন্ধু না এবং একজন আরেকজনকে চেনেও না। একে অন্যের পরিচয় হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এমন বিষয়টি জানতে পারলে আমরা তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের হাতে তুলে দিই।’

সেদিন ঘটনাস্থলে থাকা শিক্ষিকার পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি ওই দুই শিক্ষার্থী। এ বিষয়ে ডিনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি ওই শিক্ষিকার পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি। বরং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষিকা কোনো দুর্ব্যবহার করেননি বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে এ ঘটনায় ওই দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে থাকা ওই তরুণকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং ঘটনার পরদিনই ওই শিক্ষার্থীর ক্যামেরাও ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান এই অধ্যাপক।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. একেএম গোলাম রব্বানীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু ঘটনাস্থলে আমি ছিলাম না তাই এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। আপনি ডিন স্যারের সঙ্গে কথা বলুন, তার কাছ থেকেই সঠিক কি ঘটেছিল জেনে নিন।

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।