
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এখন মাদকের হটস্পট। ইয়াবা ও আইস পাচারের পাশাপাশি অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মানব পাচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, অভিযান অব্যাহত থাকলেও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের একাধিক গ্রুপ এখনও তৎপর রয়েছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক দফতরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রবেশ করা মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। অন্যদিকে আঙ্কটাডের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকার মাদক পাচার হয়। সীমান্ত ঘেঁষা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ব্যবহার করে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি ইয়াবা ব্যবসা চালাচ্ছে।
জেলা পুলিশের হিসাবে, শুধুমাত্র চলতি বছরের আট মাসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হত্যা, মাদক, অপহরণ, ধর্ষণসহ ১০ ধরনের অপরাধে হয়েছে ২৫০টি মামলা। এর মধ্যে হত্যা মামলা ১৮টি, মাদক মামলা ১৫০টি, অপহরণ মামলা ৫০টি এবং ধর্ষণের মামলা ১২টি। ২০১৭ সাল থেকে গত আট বছরে খুন হয়েছেন ৩০০ জনের বেশি রোহিঙ্গা; দায়ের হয়েছে ২৮৭টি হত্যা মামলা।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, বর্তমানে টেকনাফ-উখিয়ার ক্যাম্পগুলোতে অন্তত ১০টি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয়। আগে এ সংখ্যা ছিল ১৪। এদের মধ্যে টেকনাফের আবদুল হাকিম বাহিনী মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অপহরণে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। মুক্তিপণ না পেলে হত্যা করে লাশ গুমের অভিযোগও রয়েছে এ বাহিনীর বিরুদ্ধে।
ক্যাম্পবাসীদের মতে, অপহরণ এখন নিয়মিত ঘটনা। টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের বাসিন্দা কালা মিয়া জানান, গত মে মাসে তাকে অপহরণ করে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর মুক্তি পান তিনি। একই ক্যাম্পের সাবের আলমও ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসেন। তাদের দাবি, এসব ঘটনায় জড়িত অন্তত ১০টির বেশি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
রোহিঙ্গা নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ক্যাম্পগুলোতে শতাধিক নতুন মাদক আখড়া গড়ে উঠেছে। বর্তমানে চার শতাধিক স্থানে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বিক্রি ও সেবন চলছে। স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পরিবর্তনের পর অভিযানের ঘাটতিকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো।
৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক বলেন, “১৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা থাকলেও পুলিশ সদস্য সংখ্যা তুলনামূলক অপ্রতুল। তবু রাত-দিন কাজ করছি, তাই খুনের ঘটনা কমেছে। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও জেলা পুলিশের মুখপাত্র মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, মাদক নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তার ভাষায়, “রোহিঙ্গাকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে যৌথভাবে কাজ চলছে, বিশেষ করে মাদক নিয়ন্ত্রণে আমরা সর্বোচ্চ তৎপর আছি।”
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, “খুন কিছুটা কমলেও মাদক এবং অপহরণ বেড়েছে। ক্যাম্পবাসীরা প্রতিদিন ভয়ভীতির মধ্যে আছেন। এর একমাত্র সমাধান তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন।”
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনা নিধনযজ্ঞ থেকে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে ঢল নামে রোহিঙ্গাদের। বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। তবে সীমান্ত পেরিয়ে শুধু ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা এসেছে। তাদের মধ্যে ১ লাখ ২১ হাজার নিবন্ধিত হলেও বাকিরা অবৈধভাবে ক্যাম্পে অবস্থান করছে। সব মিলিয়ে এখন ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আছে। এছাড়াও প্রতি বছর ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে আরও ৩০ হাজার করে শিশু।
*মানবিক কারণে আহত-অসহায় রোহিঙ্গাদের প্রবেশের সুযোগ : কর্নেল মহিউদ্দিন* ওবাইদুল হক চৌধুরী ,বিশেষ প্রতিবেদক
মিয়ানমারে নির্যাতিত হয়ে সীমান্তে আসা রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) সকালে কক্সবাজারের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ তথ্য জানান।
কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আহত ও অসহায় কিছু রোহিঙ্গার অবস্থা দেখে মানবিকতার খাতিরে তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়েছে। তবে সীমান্ত সুরক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করছি। মাদক ও অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চলছে।”
তিনি আরো বলেন, “সীমান্ত পরিস্থিতি মোকাবেলায় এরইমধ্যে সরকার বিজিবিতে জনবল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
আরাকান আর্মির কাছে জিম্মি থাকা বাংলাদেশি জেলেদের প্রসঙ্গে কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “এ পর্যন্ত ৫১ জন জেলে তাদের কাছে জিম্মি আছে। যদিও তাদের সঙ্গে আমাদের অফিসিয়াল যোগাযোগ নেই, তবে আনঅফিসিয়াল যোগাযোগ চলছে। আমরা তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছি, যেন আর কোনো জেলে অপহরণ না হয়।”
তিনি জেলেদের উদ্দেশ্যে বলেন, “সাগরে মাছ ধরতে গেলে অবশ্যই নির্ধারিত জলসীমা মেনে চলতে হবে। অসচেতনতা এবং কিছু চোরাকারবারির সহায়তায় সীমান্ত অতিক্রমের কারণে অনেক সময় তারা ঝুঁকিতে পড়ছেন।”
মতবিনিময় সভায় কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারি, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শামসুল হক শারেক, হাসানুর রশীদসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর