নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) রাস্তা মেরামতের ঠিকাদারের কাছ থেকে স্থানীয় নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল নেতার যোগসাজশে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী ঠিকাদার নাজমুল হুদা পাটোয়ারী, যিনি খিলক্ষেত থানা বিএনপির সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ বিষয়ক সম্পাদক।
অভিযুক্তরা হলেন স্থানীয় নেতা মো: রাশেদ (পিতা: মৃত মোঃ মোস্তফা) ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মো. আমিনুল ইসলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ লক্ষ ১৭ হাজার টাকার রাস্তা সংস্কার ও মেরামত প্রকল্পে ঠিকাদারকে হেনস্তা, মানসিক চাপ ও হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় নোবিপ্রবির লাইব্রেরি ভবন থেকে আবাসিক এলাকা গেট, পুরাতন মসজিদ থেকে ডর্মেটরি ভবন-০১ এবং ভিসি বাংলোতে রাস্তা সংস্কার ও মেরামত কাজ নিয়ে। মেসার্স এসবিএন ইঞ্জিনিয়ারিং এন্টারপ্রাইজ এই কাজের কার্যাদেশ পায়। স্থানীয় সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদার নাজমুল হুদা পাটোয়ারীকে জিম্মি করে চাঁদা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ তার।
নাজমুল হুদা পাটোয়ারী অভিযোগ করেন, তিনি দলীয় পরিচয় ব্যবহার না করেই কাজটি নিয়েছিলেন। কিন্তু কাজ করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের সদস্যরা এক হয়ে তাকে সারাদিন জিম্মি করে রাখে। ঢাকা থেকে নোয়াখালী জেলা নেতাদের ফোন করিয়ে নগদ চাঁদা না নিয়ে বিল পেয়ে দেওয়ার শর্তে সন্ধ্যায় তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এসময় তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি ও হাত-পা ভেঙে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, রাশেদ তার সাথে সবচেয়ে বেশি দুর্ব্যবহার ও সন্ত্রাসী আচরণ করেছেন। তাদের চাহিদামতো টাকা দিতে না পারায় লেবার সর্দার নোমান ছাত্রদল নেতা আমিনুলকে নিয়ে আসে। তারা সাবকন্ট্রাক্টরের সাথে মিলে সালিশীর নামে গত ২৫/১০/২৫ তারিখ থেকে দুর্ব্যবহার করে এবং কাজ না করেই অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার ফন্দি আটে। তখন রাশেদ ও মিঠু তাকে নানানভাবে চাপ দিয়ে মানসিক হেনস্তা করে অন্যায়ভাবে ৫৩ হাজার টাকা ২৭/১০/২৫ তারিখে দেওয়ার শর্তে একটি চুক্তি করতে বাধ্য করে। ঐ তারিখে বিল না হওয়ায় তিনি টাকা না দিলে ৩০/১০/২৫ তারিখে প্রযুক্তির ইঞ্জিনিয়ারদের তিন তলার বারান্দায় লেবার সর্দার নোমান প্রকাশ্যে প্রযুক্তির নবগঠিত ছাত্রদলের কমিটির সহ-সভাপতি আমিনুলকে দেখিয়ে বলে যে তাকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভাড়া করে আনা হয়েছে তাকে ধরার জন্য। সেদিন তারা সকলে মিলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসে জিম্মি করে রেখে বাহিরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
সাব কন্ট্রাক্টর চুক্তির সমপরিমাণ কাজ না করলেও চুক্তি মূল্যের অতিরিক্ত আরও ৯৩ হাজার টাকা দিতে আমিনুল ও মিঠু মিথ্যা সাক্ষী সাজিয়ে তাকে চাপ দিতে থাকে। আমিনুল তাকে বলেন, "ছাত্রলীগ থাকলে আপনার ২ লাখ টাকা এমনেই দেওয়া লাগতো, এই অল্প টাকা নিয়ে এত ঝামেলা কেন করতেছেন।" এ অবস্থায় অফিসের ইঞ্জিনিয়াররা অফিসের পরিবেশ ঠিক রাখার স্বার্থে এবং তার জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদেরকে বলেন যে ঠিকাদার বিল পেয়ে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে দেবে, আর কোনো টাকা দাবি করবে না। এরপর তারা চলে গেলে তিনি দুপুর আড়াইটার দিকে অফিস থেকে বের হয়ে আসলে তারা তাকে পুনরায় সন্ধ্যা পর্যন্ত জিম্মি করে রাখে। তখন তিনি নোয়াখালীর একাধিক বিএনপি নেতার শরণাপন্ন হয়ে মুক্তি পেয়ে রাতের অন্ধকারে ঢাকায় চলে যান। পরবর্তীতে গত ১৩/১১/২৫ তারিখে চেক পাস হলে তারা অফিসে গিয়ে ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে দুর্ব্যবহার, অপমান অপদস্ত করে নগদ ৪০ হাজার টাকা আদায় করে নেয়। এতে তার প্রায় ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত স্থানীয় নেতা রাশেদ বলেন, সাব কন্ট্রাক্টরের সাথে ঠিকাদার নাজমুলের সমস্যা হলে তিনি মিঠু সাহেবকে বলেন। পরে মিঠু সাহেব তাকে স্থানীয় হওয়ায় সাথে নিয়ে যান। তিনি ঠিকাদার নাজমুল সাহেবকে তার জিম্মায় নিয়ে বাকি টাকা পরিশোধ করা হবে মর্মে মীমাংসা করে দেন। কিন্তু টাকা না দিয়ে নাজমুল ঢাকায় পালিয়ে যান। ঢাকা থেকে আসলে অফিসে এটার সমাধানের জন্য যাওয়া হয় এবং পরবর্তী পনেরো দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ করবে বলা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আমিনুল ভাইও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তারপরও ঐ ঠিকাদার টাকা না দিলে তিনি এটা অফিসে জানান এবং মঈনুদ্দিন সাহেব নিজে টাকা দিয়ে দেন। মূলত তিনি যে টাকার জিম্মা নিয়েছেন, সে টাকা নিতে গিয়েছিলেন।
অভিযোগের বিষয়ে নোবিপ্রবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি ওখানে রাশেদ ভাইয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার কারণে গিয়েছিলেন। তার সাথে তার ভালো সম্পর্ক। একদিন রাশেদ তাকে বলেন যে একজন ঠিকাদার পাওনা টাকা না দিয়ে চলে গেছে। তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাডে একটা চুক্তি ছিল, সেখানে ইঞ্জিনিয়ারদের স্বাক্ষরও আছে। পরে তিনি অফিসে গিয়ে প্রশাসনকে এটার সমাধান করতে বলতে গিয়েছেন। "ছাত্রলীগ থাকলে ২ লক্ষ টাকা এমনে দেওয়া লাগতো" এমন কোনো কথা তিনি বলেননি। তার সাথে তার এমন কোনো কথা হয়নি। দশ হাজার টাকায় ভাড়া করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বিষয়ে তিনি বলেন, "এরকম কোনো বিষয় না, এরকম কিচ্ছু না।" তবে পরে তিনি জানান, অন্য এক সুপারিশ ঠিকাদারের পক্ষ হয়ে গিয়েছিলেন যেন ঝামেলা না হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মোঃ মাইন উদ্দিন বলেন, রাশেদ এবং ঠিকাদারের মধ্যে টাকা নিয়ে তাদের অফিসে হট্টগোল হয়েছিলো। পরবর্তীতে তিনিসহ অফিসে অন্যান্য কর্মকর্তা যারা ছিলেন তাদেরকে নিয়ে বসে বিল পাওয়ার পর ঠিকাদার টাকা পরিশোধ করবে শর্তে মিটমাট করে দেন। গত ১৩ নভেম্বর রাশেদ ও তার লোকজন এসে টাকার জন্য আবারও হট্টগোল শুরু করলে তিনি অফিসের শৃঙ্খলা ও সম্মান রক্ষার্থে নিজের থেকে ৪০ হাজার টাকা তাকে দেন। এ বিষয়ে পরবর্তীতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
বাহিরের কোনো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা আর্থিক লেনদেন করতে পারে কিনা এমন প্রশ্নে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মোঃ জামাল হোসেন বলেন, তিনি হয়তো সৎ উদ্দেশ্যেই দিয়েছেন। যেহেতু এটা অফিসিয়াল কোনো বিষয় না তাই এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না।
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর