ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিন ও দ্বিতীয় দিনে চট্টগ্রামের চারটি আসনে ১৪ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এসব প্রার্থীদের ব্যাংক ঋণ, ঋণখেলাপী, মৃত ব্যক্তির নামে সাক্ষর, দলীয় মনোনয়ন না থাকা ও ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে ত্রুটি এবং তথ্যের ঘাটতির কারণে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বেশ কয়েকজন প্রার্থীর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিয়ে কাগজপত্র হালনাগাদের জন্য সময় নির্ধারণ করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ও বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রমে এই মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ আশরাফ ছিদ্দিকির মনোনয়নপত্রে দাখিল করা ভোটারদের সাক্ষরের তালিকায় একজন মৃত ব্যক্তির নাম ও সাক্ষর পাওয়া যায়। বিষয়টি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়ার পর তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়।
এছাড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিদ্রোহী প্রার্থী শহিদুল ইসলাম চৌধুরীর দলীয় মনোনয়ন না থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। অপরদিকে জাতীয় পার্টি (জাকের) প্রার্থী মোহা. এরশাদ উল্ল্যা নিজেই নিজের প্রস্তাবকারী হওয়ায় নির্বাচন বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগে তার মনোনয়নও বাতিল হয়।
চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে ৪ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী জিন্নাত আক্তার, আহমদ কবির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এইচ এম আশরাফ বিন ইয়াকুব এবং গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান। তাদের মধ্যে জিন্নাত আক্তার প্রদত্ত ১ শতাংশ ভোটারদের মধ্যে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে ১০ জনকে যাচাই করা হয়।
এর মধ্যে আটজনই সাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাই বাতিল করা হয়েছে। মধ্যে- জিন্নাত আক্তার প্রদত্ত ১ শতাংশ ভোটারদের মধ্যে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে ১০ জনকে যাচাই করা হয়। এর মধ্যে আটজনই সাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তাই বাতিল করা হয়েছে। আহমদ কবিরের ১২ (ক-১) ধারা অনুসারে ১ শতাংশ ভোটারের সাক্ষর না থাকায় মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।
এছাড়াও, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী এইচ এম আশরাফ বিন ইয়াকুব দলীয় মনোনয়ন ও হলফনামা না দেয়ায় মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী রবিউল হাসানের সমর্থনকারীর সাক্ষর না থাকায় সাক্ষরের জন্য চারটা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছিল।
চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ ছালাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ ছালাম এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারের মনোনয়ন দাখিল করেন। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জিএম কাদেরের সাক্ষরিত প্রার্থীকে দলীয় প্রার্থী হবেন বলে জানানো হয়। রুহুল আমিনের সাক্ষরিত মনোনয়ন দেয়ায় তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মোয়াহেদুল মাওলা ঋণখেলাপী ও ১ শতাংশ প্রদত্ত সাক্ষরের মধ্যে দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে যাচাই করা ১০ জনই ভোটারই সাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন দ্বৈত নাগরিক উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমেরিকান গ্রিনকার্ড দাখিল করেননি। সর্বশেষ ভ্রমণের তথ্যসহ বিকাল ৪টার পর্যন্ত সময় দেয়া হয়। সময়মত তথ্য দাখিল না করায় মনোনয়ন বাতিল বলে গণ্য করা হয়।
এরআগে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম-১১ আসনে বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী জাহাঙ্গীরের দাখিল করা এক শতাংশ ভোটারের মধ্যে ১০ জন ভোটারকে যাচাই করা হয়। এর মধ্যে পাঁচ জনের ঠিকানা সঠিক ও পাঁচ জনের ঠিকানা সঠিক ছিল না। যা যাচাই বিধিমালা-১১ অনুসারে মনোনয়ন বাতিল হিসেবে গণ্য হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নুর উদ্দিনের দলীয় মনোনয়ন ফর্মে প্রার্থীর নাম, ভোটার নম্বর ও নির্বাচনী এলাকা উল্লেখ ছিল না। তাই বাতিল করা হয়েছে। গণ অধিকার পরিষদের মুহাম্মদ নেজাম উদ্দীনের কাছে সিটি করপোরেশনের ৯৭ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। যা পরিশোধ করা হয়নি। তাই বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এছাড়াও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এ কে এম আবু তাহের ব্যাংকের কাছে ঋণখেলাপী, দলীয় মনোনয়ন নেই এবং সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স আপডেট না থাকায় মনোনয়ন বাতিল হয়েছে।
চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে বৈধ প্রার্থীরা হলেন- জাতীয় পার্টির সৈয়দ শাহাদাত হোসেন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল-রেজি-৪০) শেখ জুলফিকার বুলবুল চৌধুরী, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নুরুল আমিন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এ কে এম আবু ইউসুফ, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ ছাইফুর রহমান, ইনসানিয়াত বিপ্লবের রেজাউল করিম এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফেরদৌস আহমদ চৌধুরী। চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বৈধ প্রার্থীরা হলেন বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন, জনতার দলের মোহাম্মদ গোলাম নওশের আলী এবং সুপ্রিম পার্টির দুই প্রার্থী শাহজাদা সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমদ ও মো. ওসমান আলী। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপি এবং জামায়াতের প্রার্থীদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বৈধ প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মোস্তফা কামাল পাশা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ আলা উদ্দিন। এছাড়া চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, জামায়াতের মোহাম্মদ শফিউল আলম, জাতীয় পার্টির আবু তাহের, বাসদের (মার্কসবাদী) দীপা মজুমদার, গণফোরামের উজ্জ্বল ভৌমিক, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের আবু তাহের, বাসদের নিজামুল হক আল কাদেরী এবং ইনসানিয়াত বিপ্লবের আজিজ মিয়ার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
জেল প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আচরণ বিধি লঙ্ঘন হলে আমরা বিন্দুমাত্র ছাড় দিব না। আন্তর্জাতিক মহলে আমরা দেখিয়ে দিতে চাই আমরাও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দিতে পারি। সকল প্রার্থীদের প্রতি অনুরোধ থাকবে নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত যেন তারা আচরণ বিধি মেনে চলেন।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে শুক্রবার ও বৃহস্পতিবার শুধু চারটি আসনের মনোনয়নপত্র যাচাইবাছাই হয়েছে। আজ শনিবার (৩ জানুয়ারি) ও আগামীকাল রবিবার (৪ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম মহানগরী ও সংলগ্ন উপজেলা মিলিয়ে ৫টি আসনের মনোনয়নপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে যাচাইবাছাই হওয়ার কথা আছে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর