ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র অপহরণ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের প্রতি কড়া বার্তা দেন ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ইয়াইর লাপিদ। তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, তা তেহরানের গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের ঝুঁকি জোরালো হয়েছে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক ধরনের নতুন আইনহীনতা তৈরি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ইরান যেন তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করতে না পারে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়াতে না পারে—এটাই তার সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি ইসরায়েলের ওপর হামলা চালায়, তবে তেহরানকে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান সম্পূর্ণ স্পষ্ট ও দৃঢ়। তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি অ-আলোচনাযোগ্য রেড লাইন রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধে বাধ্য করা, সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর কঠোর ও নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা।
নেতানিয়াহু আরও বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় সক্রিয় হওয়া এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প শক্তিশালী হয়ে ওঠা ঠেকানোই এই নীতির মূল লক্ষ্য। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকেও এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বৈঠকে দুই দেশই ইরানের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে একমত হয়।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, ইরান মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক মহড়া এসব কর্মকাণ্ডেরই ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে তিনি পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের ওপর হামলা হলে দেশটি শক্ত প্রতিক্রিয়া জানাবে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের দাবিতে আন্দোলনরত ইরানি জনগণের পাশে রয়েছে ইসরায়েল এবং বর্তমান সময়টি ইরানি জনগণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের এক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, তেহরানে আশঙ্কা রয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে ইরান। এই আশঙ্কার মধ্যেই দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে রিয়ালের দরপতন ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা পরে দেশের ২৬টি প্রদেশের ৭৮টি শহরে ছড়িয়ে পড়ে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এসব বিক্ষোভে অন্তত ২২ জন নিহত এবং প্রায় এক হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নেওয়ার ঘটনায় ইরানের মিত্রদের নিয়ে গড়ে তোলা আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক আরও দুর্বল হতে পারে। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বলতার পর এই বলয় এমনিতেই সংকুচিত হয়ে পড়েছিল। জামাল আবদির মতে, ট্রাম্প যদি নিশানাভিত্তিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ধারণায় আরও উৎসাহিত হন, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধের চাপ বাড়তে পারে। তার ধারণা, মাদুরো অপহরণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান সামরিক প্রতিরোধ শক্তিশালী করা কিংবা সম্ভাব্য আগাম আঘাতের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভি বলেন, তেহরানে যা দেখা ও শোনা যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায় ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় যেতে ইরান আগ্রহী নয়। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র কার্যত পূর্ণ আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, ফলে কূটনীতির সুযোগ প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষই সংঘাতের পথে এগোচ্ছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর