ইরানে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এই বিক্ষোভকে দেশটির সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুরবস্থা, গত বছর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত এবং দীর্ঘদিনের জনঅসন্তোষের প্রেক্ষাপটে ইরানি সরকারকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি দুর্বল মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
প্রথমদিকে বিক্ষোভের মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক সংকট। গত বছর ইরানি রিয়ালের মূল্য ডলারের বিপরীতে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে এবং চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনে সরাসরি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে স্লোগান যুক্ত হয় এবং তা সরকারবিরোধী রূপ নেয়।
ইরানি মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানায়, গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৪৮ জন বিক্ষোভকারী রয়েছেন।
এদিকে, বার্তা সংস্থা আনাদোলুর বরাতে আল জাজিরা জানায়, বৃহস্পতিবার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কেরমানশাহে বিক্ষোভ চলাকালে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অন্তত ৮ সদস্য নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষে আরও বহু মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এই সহিংসতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। শুক্রবার ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানির নেতারা যৌথ বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং ইরানি কর্তৃপক্ষকে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান ডুজারিক বলেন, বিশ্বের যেকোনো স্থানে মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে এবং সরকারগুলোর দায়িত্ব সেই অধিকার রক্ষা করা।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে বাস, গাড়ি ও মোটরসাইকেলে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ রেলস্টেশন ও ব্যাংকে অগ্নিসংযোগের দৃশ্যও সম্প্রচার করা হয়। রয়টার্স যাচাইকৃত ভিডিওতে রাজধানী তেহরানে শত শত মানুষকে মিছিল করতে দেখা যায়। কিছু ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের ‘খামেনেয়ির মৃত্যু হোক’সহ সরকারবিরোধী স্লোগান দিতে শোনা গেছে।
ইরানের মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গা জানায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর বেলুচ অধ্যুষিত জাহেদানে একটি বিক্ষোভ মিছিলে গুলি চালানো হলে বেশ কয়েকজন আহত হন। একই দিনে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শিরাজে বিক্ষোভকারীরা ‘এটাই রক্তের বছর, আলী খামেনেয়ি ক্ষমতাচ্যুত হবে’—এমন স্লোগান দেন।
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান পরিস্থিতি শান্ত করতে নিরাপত্তা বাহিনীকে “দয়ালু ও দায়িত্বশীল আচরণ” করার আহ্বান জানান এবং মূল্যস্ফীতিজনিত দারিদ্র্য মোকাবিলায় সীমিত আর্থিক প্রণোদনার ঘোষণা দেন। তবে বিক্ষোভ আরও সহিংস হয়ে ওঠায় শুক্রবার সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ি কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র কখনোই “ভাঙচুরকারীদের” সামনে পিছু হটবে না।
বিক্ষোভের মধ্যে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ ব্যাপকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষক সংস্থা নেটব্লকস জানায়, শুক্রবার পর্যন্ত দেশটি কার্যত ২৪ ঘণ্টা ধরে অফলাইনে রয়েছে এবং সংযোগ স্বাভাবিক সময়ের মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলেও; দুবাই ও ইরানের মধ্যে অন্তত ১৭টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার ইরান সরকারকে নতুন করে সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, আনাদোলু।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর