খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম ভেঙে ঠিকাদারি বিক্রি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং অনিয়মের প্রতিবাদ করায় স্থানীয়দের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পানছড়ি উপজেলার মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রায় ২ কিলো ৩০০ মিটার সড়ক কার্পেটিংয়ের কাজটি পায় মেসার্স কবিরঞ্জন ত্রিপুরা নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে কার্যাদেশ পাওয়ার পর এই কাজ শুরু করেন সাব ঠিকাদার জাহাঙ্গীর। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি সরকারি ক্রয়নীতি ও এলজিইডির বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন।
কাজ হাতে পাওয়ার পর জাহাঙ্গীর সড়ক নির্মাণের ন্যূনতম মানদণ্ড অনুসরণ না করে তড়িঘড়ি করে কার্পেটিংয়ের কাজ শুরু করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাস্তার বেজ যথাযথভাবে প্রস্তুত না করেই কার্পেটিং করা হচ্ছে। রাস্তায় ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের ইট, সাববেজ এবং কংকর।
এছাড়াও কাজে প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিটুমিন ব্যবহার করা হয়নি এবং পাথরের মানও অত্যন্ত নিম্নমানের। ফলে ৩০০ মিটার কাজ শেষ হওয়ার আগেই রাস্তার বিভিন্ন অংশে ফাটল ও ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, এ ধরনের নিম্নমানের কাজ কয়েক মাসের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সরাসরি জনগণের অর্থের অপচয়। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করলে উল্টো তাদের হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই জাহাঙ্গীর ও তার লোকজন স্থানীয়দের নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। এতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে এলাকাবাসী সড়কে নেমে এসে বিক্ষোভ মিছিল করেন। বিক্ষোভকারীরা কাজ বন্ধ করে নির্ধারিত মান অনুযায়ী পুনরায় সড়ক নির্মাণের দাবি জানান।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া স্থানীয়দের ভাষ্য, এলজিইডির তদারকি না থাকায় ঠিকাদারি বিক্রি ও প্রকাশ্য অনিয়ম দিনের পর দিন চলছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন- এত বড় প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ চললেও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা কেন নীরব? স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও তদারকি কর্মকর্তাদের অবহেলা কিংবা যোগসাজশ ছাড়া এমন অনিয়ম সম্ভব নয়। তাদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো প্রকল্পটি নিম্নমানের কাজের কারণে অচিরেই অকেজো হয়ে পড়বে।
এলাকাবাসী দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, ঠিকাদারি বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং প্রকল্পের কাজ নতুন করে মানসম্মতভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সাব ঠিকাদার জাহাঙ্গীর বলেন, 'কাজে কোন অনিয়ম হয়নি। এলজিইডির ইঞ্জিনিয়াররা সরজমিনে উপস্থিত থেকে ভালভাবে কাজ দেখবাল করছেন। স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি বিভিন্ন অজুহাতে ঝামেলা সৃষ্টি করেছে।
পানছড়ি এলজিইডি প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) রাজু আহমেদ বলেন, 'আমি মূলত খাগড়াছড়ি সদরের দায়িত্বে রয়েছে, মাসখানেক আগে পানছড়িতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেয়েছি। অনিয়মের অভিযোগ পেয়ে আমি শুক্রবার রাতেই পানছড়িতে ছুটি আসি। যতটুকু কার্পেটিং সম্পন্ন হয়েছে পুরো কাজ যাচাই-বাছাই করা হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে রাস্তা ভেঙে আবার করানো হবে। অনিয়মের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।'
এ বিষয়ে পানছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা নাসরিন বলেন, অভিযোগ পেয়ে আমরা এলজিইডি কর্তৃপক্ষ, ঠিকাদার এবং স্থানীয়দের নিয়ে বসেছি। এলজিইডি বর্তমানে কাজ বন্ধ রেখেছে। আমরা সুষ্ঠুভাবে কাজ তদন্ত করব। কোন অনিয়ম হলে ছাড় দেওয়া হবেনা।'
মাসুম/সাএ
সর্বশেষ খবর