আর্থিক সংকট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল ঘোষণা থেকে সরে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এ উদ্দেশ্যে গঠিত পে-কমিশনকে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নতুন পে স্কেল ঘোষণা সম্ভব না হলেও একটি কাঠামো (ফ্রেমওয়ার্ক) প্রস্তুত করা হবে।
এ বিষয়ে সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) পে-কমিশনের দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান।
কমিশনের একটি সূত্র জানায়, পে-কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেবে। তবে সরকারের হাতে সময় স্বল্প হওয়ায় এই মেয়াদে পে স্কেল ঘোষণা করা হবে না। প্রতিবেদনটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সূত্র আরও জানায়, রাজনৈতিক, আর্থিক ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণে কমিশন গঠন করা হলেও এর ঘোষণা কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার বর্তমানে নির্বাচন প্রস্তুতিতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে আর্থিক সংকটের কারণে নির্বাচনের আগে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার সম্ভাবনা নেই।
তবে পে-কমিশনের প্রতিবেদন জমা পড়লে তার আলোকে একটি সুপারিশমালা চূড়ান্ত করবে বর্তমান সরকার। নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার সেটি বাস্তবায়ন করবে। এ সময় পর্যন্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী মহার্ঘ ভাতা পেয়ে যাবেন।
সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নবম পে স্কেল নির্ধারণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ২১ জানুয়ারি পে-কমিশনের চূড়ান্ত সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই সভায় নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে, যা পরে প্রধান উপদেষ্টা ও অর্থ উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হবে। তবে হস্তান্তরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে জানান, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন পে স্কেল ঘোষণার কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না, যা বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তিযুক্ত।
এদিকে কমিশনের অপর এক সূত্র জানায়, বেতনের অনুপাত নিয়ে তিন ধরনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। ১:৮, ১:১০ এবং ১:১২। এর মধ্যে ১:৮ অনুপাত চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সর্বনিম্ন বেতন নিয়ে তিনটি প্রস্তাব পর্যালোচনা হয়েছে। পরবর্তী সভায় বিষয়টি চূড়ান্ত হতে পারে। নতুন বেতন কাঠামোতে ‘১:৮, ১:১০, ১:১২ ও অন্যান্য বিকল্প রাখা হয়েছে। এই অনুপাতের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্কেলের মূল বেতন বোঝানো হচ্ছে। অর্থাৎ সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মজীবীর বেতন যদি এক টাকা হয়, তবে সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতন হবে ৮ টাকা। আরো পরিষ্কারভাবে বললে, ১০০ টাকা বেতন ধরে ১:৮ অনুপাতে সর্বনিম্ন (২০তম) গ্রেডের বেতন ১০০ হলে সর্বোচ্চ হবে ৮০০ টাকা। সর্বনিম্ন বেতন নিয়ে তিনটি প্রস্তাব এসেছে। এর মধ্যে প্রথম প্রস্তাব ২১ হাজার টাকা বেতন স্কেল ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে ১৭ হাজার এবং সবশেষ তৃতীয় প্রস্তাবে ১৬ হাজার টাকা বেতন স্কেল করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মচারীদের বেতন সমন্বয়ের লক্ষ্যে গত ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যবিশিষ্ট ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করা হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ করাই কমিশনের প্রধান দায়িত্ব।
কমিশনকে কর্মচারীদের পারিবারিক ব্যয় নিরূপণে পরিবারের সদস্যসংখ্যা ছয়জন ধরে হিসাব করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রথম বৈঠকের পর থেকে ছয় মাসের মধ্যে কমিশনকে সুপারিশ জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। গত মাসের ১৪ তারিখ কমিশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি কমিশনের ছয় মাসের মেয়াদ পূর্ণ হবে।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এ প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কমিশনকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সময়োপযোগী একটি বেতন কাঠামো ঘোষণাই সরকারের লক্ষ্য। তবে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন থাকায় প্রস্তুতির বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। সময় পাওয়া গেলে বর্তমান সরকার বেতন কাঠামো ঘোষণা করবে, আর পরবর্তী সরকার এসে তা বাস্তবায়ন করবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর