যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ইরানকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা শুরু হয়। অনেকের ধারণা, কারাকাসে যদি একজন ক্ষমতাসীন কর্তৃত্ববাদী নেতাকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে একই পরিণতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই তুলনা শুধু ভুলই নয়, বরং ইরানের জনগণের জন্য বিপজ্জনকও হতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরিয়ে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র যে লক্ষ্য অর্জন করেছে, তা আসলে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়। যদিও মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নেওয়া হয়েছে, তবে তাঁর দীর্ঘদিনের সহযোগী ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট ও সামরিক বাহিনীর বড় অংশের সমর্থন নিয়ে তিনি এখনো ক্ষমতায় টিকে আছেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে, দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি এবং শাসকগোষ্ঠী মূল ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
এই বাস্তবতা দেখায়, ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ প্রকৃত রাজনৈতিক রূপান্তর বা গণতান্ত্রিক উত্তরণের নিশ্চয়তা দেয় না। বরং ভেনেজুয়েলায় এমন একটি শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা চাপ সামলে নিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, বাইরের বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে সাজিয়েছে, কিন্তু ভেতরের ক্ষমতার ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখেছে। এমনকি নোবেলজয়ী বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর মতো ব্যক্তিরাও নতুন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার বাইরে রয়ে গেছেন।
এই অভিজ্ঞতাকে ইরানের সঙ্গে তুলনা করাই সবচেয়ে বড় ভুল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভেনেজুয়েলা ও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো, কৌশলগত বাস্তবতা এবং টিকে থাকার পদ্ধতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সামরিক চাপ প্রয়োগ করলেই ইরানের নেতৃত্ব ভেঙে পড়বে এবং বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে না—এমন ধারণা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন দেশটির বহু শহরে ধারাবাহিক বিক্ষোভ চলছে এবং ইরান গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য কখনোই শাসনব্যবস্থার পতন বা জনগণের ‘মুক্তি’ নয়। বরং লক্ষ্য হলো এমন একটি দুর্বল কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য রাষ্ট্র তৈরি করা, যা মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবে। এই কৌশলের ফলাফল ইরানের জনগণের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। কারণ ইতিহাস বলে, একটি দুর্বল অথচ টিকে থাকা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র প্রায়ই আরও সহিংস ও কম জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয়, ‘মাদুরো-পর্বের’ পুনরাবৃত্তি ইরানে ঘটবে—এই বিশ্বাস বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এটি এমন এক বিভ্রান্তিকর ধারণা, যা ইরানের চলমান সংকটকে আরও জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর