চোখ যতদূর যায়—হলুদ আর হলুদাভ রঙের সমারোহ। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সরিষা ফুলের মিষ্টি মৌ মৌ সুবাস। গৌরীপুর উপজেলার হাটশিরা গ্রামে এমনই এক দৃশ্যের জন্ম দিয়েছেন কৃষক শাহীন মিয়া, যিনি এখন স্থানীয় কৃষকদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন।
স্বল্প সময়, অল্প খরচ এবং অধিক ফলনের কারণে সরিষা চাষে সফল হয়ে আলোচনায় এসেছেন শাহীন মিয়া। তিনি হাটশিরা গ্রামের আক্কাছ আলীর পুত্র। তাঁর সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকদের মধ্যেও সরিষা চাষে আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। কম খরচে বহুমুখী লাভ কৃষক শাহীন মিয়া জানান, সরিষা চাষের শুরুতেই বেশি বীজ বপন করলে শাক হিসেবেও বিক্রি করা যায়। বিষমুক্ত ও কীটনাশকমুক্ত হওয়ায় এই শাকের বাজারমূল্য ভালো। পাশাপাশি সরিষা ফুলেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এজন্য তিনি ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করেন না। গত বছর তিনি ৮০ শতাংশ জমিতে সরিষা আবাদ করেন। এতে খরচ হয়েছিল ৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং বিক্রি হয় প্রায় ২৭ হাজার টাকা—লাভ প্রায় দ্বিগুণ। চলতি মৌসুমে তিনি শতভাগ জমিতে চাষ করেছেন, যেখানে খরচ হয়েছে ১২ হাজার টাকা।
উপজেলায় বেড়েছে সরিষার আবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন জলি জানান,“গত বছর গৌরীপুরে ১ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছিল। চলতি বছর তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৪৫ হেক্টর। এ বছর সরিষা আবাদ করেছেন ৯ হাজার ৮৯৭ জন কৃষক। সম্ভাব্য উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৭৫০ টন।”তিনি আরও বলেন,“সরিষা চাষ মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং পরবর্তী ফসল উৎপাদনে সহায়ক। এ কারণে কৃষকরা দিন দিন এ ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।”এক জমিতে তিন ফসলের সুফল হাটশিরা গ্রামের কৃষক আব্দুল আলী জানান,“একই জমিতে আগাম আমন ধান, তারপর সরিষা এবং পরে বোরো ধান চাষ করা যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন বাড়ছে,অন্যদিকে জমির উর্বরতাও রক্ষা পাচ্ছে।”মৌ চাষে বাড়তি আয় দৌলতপুর গ্রামের কৃষক আজিম উদ্দিন আকন্দ বলেন,“সরিষা ক্ষেতের পাশে ভ্রাম্যমাণ মৌ চাষীরা মৌ বাক্স বসান। মৌমাছির পরাগায়নের কারণে ফলন বাড়ে, আবার মধু বিক্রি করেও বাড়তি আয় হয়।”
তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে গড়ে ৬–৭ মণ সরিষা উৎপাদন হয়। খরচ পড়ে ২–৩ হাজার টাকা, আর প্রতিমণ সরিষা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৩৫০ টাকা দরে। সরিষা চাষের বহুমুখী ব্যবহার সরিষা চাষের উপকারিতা শুধু তেল উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নয়। সরিষার শাক ও ফুল বিক্রি করা যায় গাছের আঁটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয় খৈল গবাদিপশু ও মাছের খাদ্য তেল সারাবছর রান্নায় ব্যবহারযোগ্য সরিষা তেলের গুণাগুণ সরিষার তেলে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন এ ও ই, ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড। নিয়মিত সরিষার তেল ব্যবহারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমে এবং হজমশক্তি উন্নত হয়। ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট উপশমেও এটি কার্যকর। সরিষা ফুলের পুষ্টিগুণ ও রান্না সরিষা ফুলে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ফাইবার, ভিটামিন সি ও খনিজ উপাদান। এটি হালকা জ্বর, সর্দি ও কাশি উপশমে প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।খাওয়ার উপায়:১. সরিষা ফুল ভাজি২. সরিষা ফুলের বড়া ৩. সরিষা ফুলের ভর্তা: সরিষা ফুল ধুয়ে সেদ্ধ করে ভর্তাও খুব সুস্বাদু। সেদ্ধ ফুলের সঙ্গে সরিষার তেল, কাঁচা মরিচ, লবণ এবং পেঁয়াজ মিশিয়ে একটি মসৃণ ভর্তা খাবারে বাড়তি স্বাদ এনে দেয়। ৪. সবজির সঙ্গে মিশিয়ে রান্না: সরিষা ফুল শীতকালীন অন্যান্য সবজির (যেমন আলু, বেগুন বা শিম) সঙ্গে মিশিয়ে ভাজি বা ঝোল রান্নায় ব্যবহার করা যায়। এটি রান্নার স্বাদ এবং পুষ্টি বাড়ায়। ৫. মশলাদার স্যুপ বা স্টু: সরিষা ফুল দিয়ে মশলাদার স্যুপ বা সবজি স্টু তৈরি করা যায়। এতে হলুদ, আদা, রসুন, এবং অন্যান্য মসলা ব্যবহার করলে স্বাদ আরও উন্নত হয়।
সরিষার শাকের গুণ : পালং শাকের চেয়ে বেশি ভিটামিন ও কমলার চেয়ে বেশি ভিটামিন সি পাওয়া যায় সরিষা শাকে- এমনটা বলছেন একাধিক গবেষক। শীতের অন্যতম সুপরিচিত শাক হচ্ছে সরিষা শাক। ভাজি, পাকোড়া কিংবা সালাদে মিশিয়ে খেতে পারেন পুষ্টিগুণে অনন্য এই শাক। উচ্চ আঁশযুক্ত সরিষা শাকে রয়েছে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল। জেনে নিন শাকটি খাওয়ার বিভিন্ন উপকারিতা সম্পর্কে। ক্যালোরি কম থাকলেও ফাইবার এবং অনেক প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে সরিষা শাকে। বিশেষ করে ভিটামিন সি এবং কে-এর একটি চমৎকার উৎস এই শাক। ফলে সার্বিকভাবে সুস্থ থাকতে চাইলে নিয়মিত খান সরিষা শাক। দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকি কমায় সরিষা শাক। এতে প্রচুর পরিমাণে শক্তিশালী ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট রয়েছে। এই উদ্ভিদভিত্তিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টগুলো কোষের বার্ধক্য, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার আচরণ থেকে আমাদের শরীরে জমা হওয়া ফ্রি র্যাডিকেলের কারণে সৃষ্ট স্ট্রেস এবং ক্ষতি থেকে রক্ষা করে। ফলে ক্যানসারের মতো রোগ থেকে দূরে থাকা সম্ভব হয়। সরিষার শাকে গ্লুকোসিনোলেটস পুষ্টি উপাদান রয়েছে যা তিক্ত স্বাদ দেয় শাকে। গ্লুকোসিনোলেট ক্যানসারের কোষের সাথে লড়াই করতে পারে এবং টিউমার গঠন প্রতিরোধ করতে পারে।
সরিষার খৈলের পুষ্টিগুণ : সরিষার খৈল মাছ, গবাদিপশু, পাখির খাদ্যে এটি মূলত আমিষের একটি অন্যতম যোগানদাতা। এরমধ্যে রয়েছে ডাইজেস্টেবল ক্রুড প্রোটিন ২৭%-২৮.৮০%, টোটাল ডাইজেস্টেবল নিউট্রিয়েন্টস(ঞউঘ) ৭৪%, টোটাল মিনেরালস কন্টেন্ট ৫.৯%, ক্রুড ফাইবার ১২.১৭%- ১৪.৪২%, এশ ৭.১৩%, ক্যালসিয়াম ০.৬% ও ফসফরাস ০.১%।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর