আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের লক্ষ্যে সামরিক ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। এ উদ্দেশ্যে চীনের সঙ্গে সরকার থেকে সরকার (জি-টু-জি) ভিত্তিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত ‘ইস্টাবলিশমেন্ট অব ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট অ্যান্ড ট্রান্সফার অব টেকনোলজি (টিওটি) ফর আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল (ইউএভি)’ শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাবের অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
গত ৬ জানুয়ারি অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৮ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি আমদানি ও স্থাপনের জন্য এলসি খোলা এবং মূল্য পরিশোধ বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫৭০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা চার অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করা হবে।
পরিশোধ পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ১০৬ কোটি টাকা, ২০২৬–২৭ ও ২০২৭–২৮ অর্থবছরে প্রতিটিতে ১৫৫ কোটি টাকা করে, এবং ২০২৮–২৯ অর্থবছরে প্রায় ১৫৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধের কথা রয়েছে। এ ছাড়া বাকি ৩৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এলসি খোলার চার্জ, ভ্যাট ও সুইফট চার্জ বাবদ দেশীয় মুদ্রায় পরিশোধ করা হবে।
এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, ড্রোন কারখানা স্থাপন বা যুদ্ধবিমান আমদানির বিষয় নিয়ে তিনি এখনই কোনো মন্তব্য করতে চান না। তার ভাষায়, কোন দেশ থেকে যুদ্ধবিমান কেনা হবে—এ নিয়ে আলোচনা চলমান রয়েছে, তাই সবকিছু চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কথা বলা সমীচীন নয়।
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান চায়না ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজি গ্রুপ করপোরেশন (সিইটিসি) ইন্টারন্যাশনাল সরবরাহকৃত প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী দেশেই ড্রোন উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা অর্জন করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
এ বিষয়ে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) সহকারী পরিচালক আয়শা সিদ্দিকা জানান, এখনো এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। বিমান বাহিনী থেকে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি বা তথ্য এলে তা জানানো হবে।
এদিকে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের আগেই প্রধান উপদেষ্টা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস প্রকল্প প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানায়, এই ড্রোন উৎপাদন কারখানা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর আমদানিতে যে ব্যয় হবে, তার জন্য বিমান বাহিনীকে অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন হবে না। প্রতিবছর বিমান বাহিনীর জন্য বাজেটে ‘অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি’ খাতে যে বরাদ্দ থাকে, সেখান থেকেই এ ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে।
এর আগে, আলোচনার মাধ্যমে সশস্ত্রবাহিনী কর্তৃক গঠিত যৌথ কমিটি ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে ২০২৭-২৮ অর্থবছর অথবা ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে পরিশোধের শর্তে ড্রোন উৎপাদন কারখানা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংগ্রহে নীতিগত অনুমোদন দেয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত একটি সমন্বয় সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে জানানো হয়, প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল (ইউএভি) বা ড্রোন উৎপাদন কারখানা স্থাপনে চীনের সঙ্গে অংশীদার হচ্ছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী।
এদিকে জানা গেছে, পাঁচটি শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে একটি শর্ত, চলতি অর্থবছরের জন্য যে অর্থ ব্যয় করতে হবে, তা প্রদত্ত বরাদ্দের মধ্য থেকে ব্যয় করতে হবে। এই কেনাকাটা বাবদ চলতি অর্থবছরের বাজেটে বাড়তি কোনো বরাদ্দ চাওয়া যাবে না।
এছাড়া, আগামী অর্থবছর থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থ বিমানবাহিনীর জন্য সংশ্লিষ্ট বছরগুলোর বাজেট সীমার মধ্যেই সংকুলান করতে হবে। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত আর্থিক বিধি-বিধান ও নিয়মনীতি যথাযথভাবে প্রতিপালন করতে হবে এবং উল্লেখিত ব্যয় এলসির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
প্রস্তাবিত চুক্তি ব্যতিত এ অর্থ অন্য কোনখাতে ব্যয় করা যাবে না বলেও উল্লেখ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সিইটিসি ইন্টারন্যাশনাল শুরুতে জাহাজ ভাড়াসহ সব মিলিয়ে ৬৪৩.৬১ কোটি টাকা প্রস্তাব করে। তবে, বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা গত নভেম্বরে চীনা সংস্থাটির প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা করে চুক্তিমূল্য ৩৫.৫৩ কোটি টাকা কমিয়ে ৬০৮.০৭ কোটি টাকা পুনঃনির্ধারণ করেন।
সিইটিসি ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক তথ্যপ্রযুক্তির সব খাতজুড়ে কার্যক্রম থাকা চীনের একমাত্র বৃহৎ প্রযুক্তি করপোরেশন এটি, যার আওতায় রয়েছে প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স, নিরাপত্তা ইলেকট্রনিক্স ও ইনফরমাইজেশন। প্রতিষ্ঠানটির পণ্য ও সেবা বর্তমানে বিশ্বের ১১০টির বেশি দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স খাতে সিইটিসি সাতটি প্রধান পণ্যব্যবস্থা উন্নয়ন করেছে। এগুলো হলো এয়ার বেস আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, সমন্বিত ইলেকট্রনিক তথ্যব্যবস্থা, রাডার, যোগাযোগ ও ন্যাভিগেশন, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ইউএভি ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম এবং সমন্বিত আইএফএফ। এছাড়া, নিরাপত্তা ও ইলেকট্রনিক তথ্য খাতে প্রতিষ্ঠানটির পোর্টফোলিওতে রয়েছে জননিরাপত্তা, ই-গভর্নমেন্ট, বুদ্ধিমান পরিবহন ব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কম্পোনেন্ট উৎপাদনসহ সংশ্লিষ্ট নানা পণ্য ও সেবা।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর