বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগ এনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের পদত্যাগ দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এছাড়া, ৩৩০ জন ‘দুষ্কৃতকারীর’ বিষয়ে সিএমপির জারি করা গণবিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখান করে এনসিপি নেতারা অবিলম্বে তাদের গ্রেফতার দাবি করেছেন।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে নগরের ষোলশহরে বিপ্লব উদ্যানে এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপি নেতারা এ দুটি দাবি তুলে ধরেন। এতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী মোহাম্মদ এরফানুল হক।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ডা. শাহাদাত হোসেনের বহাল থাকা নিয়ে জনমনে অস্থিরতা এবং ভোটারদের মধ্যে একধরনের উদ্বেগ রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র পদটি প্রজাতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পদ। এই পদে অধিষ্ঠিত থেকে তিনি বিএনপি প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় চারটি সংসদীয় আসনেই বিএনপির প্রার্থী রয়েছে। এই বাস্তবতায় বিএনপি মনোনীত একজন ব্যক্তি যদি মেয়র পদে বহাল থাকেন, তাহলে আসন্ন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু থাকে না। এটি নির্বাচনকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
তারা বলেন, নির্বাচনের নিরপেক্ষতা রক্ষার স্বার্থে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম অনেক আগেই তাদের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। একই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনকেও পদত্যাগ করতে হবে। আগামী ২৫ তারিখ বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ডের সমাবেশের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন চসিক মেয়র।
একজন সক্রিয় রাজনৈতিক দলের নেতা হয়ে তিনি মেয়র পদে বহাল থাকলে আসন্ন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হবে এবং নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে। যেহেতু চলতি মাসের ২৭ তারিখে তার মেয়াদ পূর্ণ হচ্ছে এবং আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে ভোটে প্রার্থীদের প্রচারণাও শুরু হচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় চট্টগ্রামের নির্বাচনি পরিবেশ অবাধ, সুষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ রাখতে হলে অবিলম্বে ডা. শাহাদাত হোসেনকে মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করতে হবে।
‘এখানে তারেক রহমানের নির্বাচনি সমাবেশ হবে, উনি যেভাবে সমাবেশের সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন, মেয়র পদে থেকে উনি আবু সুফিয়ানের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, ধানের শীষের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন, মেয়র পদে থেকে এটা উনি কোনোভাবেই করতে পারেন না। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী উনাকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। সুতরাং, উনি যদি ২৭ জানুয়ারির মধ্যে পদত্যাগ না করেন, আমরা তীব্র আন্দোলনে যাব, আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আমরা এটা জানিয়ে রাখলাম।’
গত ১৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) জারি করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে ৩৩০ জন ‘দুষ্কৃতকারীর’ নাম উল্লেখ করে তাদের এলাকা থেকে বহিষ্কার এবং প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এদের মধ্যে অধিকাংশই ‘জুলাই আন্দোলনের’ সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ একাধিক মামলার আসামি সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ (এমপি) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী। এ ছাড়া, আইনজীবী হত্যা মামলায় বিচারের মুখোমুখি হওয়া কারাবন্দি ইসকনের সাবেক সংগঠক চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী এবং কয়েকজন পেশাদার অপরাধীর নামও তালিকায় আছে।
সিএমপির জারি করা এ গণবিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সিএমপির গণবিজ্ঞপ্তিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা মামলার অনেক আসামি এবং চট্টগ্রামের কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম আছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি স্পষ্টভাবে এই বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাখ্যান করছে। এনসিপি মনে করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য এই বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।
প্রশ্নের জবাবে এনসিপি নেতা আরিফ মঈনুদ্দিন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে সিএমপি একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে ৩৩২ জন সন্ত্রাসীর বিষয়ে। আমাদের প্রশ্ন, সিএমপি কমিশনার যদি জানেন যে, এখানে ৩৩২ জন সন্ত্রাসী আছে, তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে, তাহলে তো পুলিশের উচিত তাদের গ্রেফতার করা। বিদেশে থাকলে প্রয়োজনে সেখান থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসা উচিত। যদি সেটা না পারে, তাহলে তাদের ছবি টানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা। এ কাজই তো পুলিশের করার কথা।’
‘কিন্তু উনি কীভাবে সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রকাশ করে বলেন যে, আপনাদের শহরের মধ্যে নিষিদ্ধ করা হলো। একজন ব্যক্তি যদি অপরাধী হয় তাহলে সে জেলে থাকবে আর যদি অপরাধী না হয় তাহলে সে ঘুরবে, সে থাকবে, বসবাস করবে। কিন্তু আপনি কিভাবে শহরের মধ্যে তাদের নিষিদ্ধ করতে পারেন ? আমরা কোনোভাবেই এটা মানি না, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে।’
গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সিএমপি সন্ত্রাসীদের সতর্ক করে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আপনারা দেখেন, এখানে সাইফুল ইসলাম লিমনের নাম আছে, হেলাল আকবর বাবরের নাম আছে, জুলাই আন্দোলনের সময় অস্ত্র হাতে তাদের ছবি আপনারা সাংবাদিকরাই তুলে পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তাদের গ্রেফতার না করে উলটো সতর্ক করে দেওয়া যে, আপনারা চট্টগ্রাম শহরে আসবেন না, আসলে আপনাদের গ্রেফতার করতে হবে। এ ধরনের একটি অপ্রয়োজনীয়, অকার্যকর এবং সন্ত্রাসীদের আরও সতর্ক করে একটা বিজ্ঞপ্তি যে দেওয়া হলো, আমরা এটার তীব্র নিন্দা জানাই। এই বিজ্ঞপ্তির বক্তব্য ভিত্তিহীন।’
‘একজন সন্ত্রাসী চট্টগ্রামে থাকতে পারবে না, তার মানে কি তারা নোয়াখালী থাকতে পারবে, ফেনী থাকতে পারবে ? এই দায়সারা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলো কেন ? যেসব সন্ত্রাসীকে বাংলাদেশের মানুষ আর দেখতে চায় না, তাদের গ্রেফতার না করে সতর্ক করে দেওয়া হলো কেন ? আমাদের দাবি, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে অন্যথায় আমরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হব।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- নগর এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়কারী জোবাইর হোছাইন, নিজাম উদ্দিন ও জসিম উদ্দিন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর