সরকারী ও বেসরকারী সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই তামাক নিয়ন্ত্রণে অনেক প্রাপ্তি যোগ হয়েছে। তামাক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে নানামূখী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকার বাজেটও বরাদ্দ করেছে। জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই অগ্রগতি অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং ইতিবাচক। সম্প্রতি ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদিত হয়েছে যা তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিকে আরো একধাপ এগিয়ে নেবার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
আজ “তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে ২০টি জেলার অবস্থা পর্যালোচনা ও করণীয়” শীর্ষক একটি মতবিনিময় সভায় এই অর্জনকে সুনিশ্চিত করতে অবিলম্বে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ কঠোর বাস্তবায়নের জোড়ালো দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট মনে করে এই জেলা ভিত্তিক প্রাপ্ত তথ্যাদিসমূহ তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও সহায়ক পলিসিসমুহ বাস্তবায়ন ও লংঘনের তুলনামূলক চিত্রের মাধ্যমে তামাক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দূর্বলতার জায়গাগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত, পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং সরকারের নীতিনির্ধারনী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা) এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্ট এর উদ্যোগে বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনের শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এই সভায় ২০ টি জেলার জেলার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরা হয়। ওয়ার্ক ফর এ বটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর নির্বাহী পরিচালক সাইফুদ্দিন আহমেদ এর সভাপতিত্বে এবং ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের হেড অব প্রোগ্রাম সৈয়দা অনন্যা রহমানের সঞ্চালনায় মতবিনিসয় সভায় সন্মানিত আলোচকচকবৃন্দ হিসেবে বক্তব্য রাখেন, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের মহাপরিচালক মো.আখতার উজ-জামান, বাংলাদেশ রেলওয়ের IBRTF প্রোজেক্ট এর কনসালটেন্ট হোসেন আলী খান্দকার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্যানেটারি ইন্সপেক্টর মো. কামরুল হাসান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জামাল নাসের খান, ঢাকা সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র শিক্ষা কর্মকর্তা শাহানা পারভীন, জুনিয়ার স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবা জেসমিন, ঢাকা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মজিদ, স্থানীয় সরকার উপপরিচালক মো. বদরুদ্দোজা শুভ, ভাইটাল স্ট্র্যটেজিসের সিনিয়র কারিগরী পরামর্শক সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের প্রোগ্রাম অফিসার ডা. মো. ফরহাদুর রেজা এবং প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হেলাল আহেমদ।
সভায় বিষয় ভিত্তিক একটি প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট এর নেটওয়ার্ক কর্মকর্তা আজিম খান। ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট ও বাটার যৌথ উদ্যোগে প্রণীত “জেলাভিত্তিক রিপোর্ট কার্ড” এর তুলনামূলক বিশ্লেষণে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। গবেষণায় দেখা যায় অন্তর্ভুক্ত জেলাসমূহের মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার সামগ্রিক বাস্তবায়ন পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সন্তোষজনক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বিপরীতে, শেরপুর জেলার বাস্তবায়ন অবস্থা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে আইন প্রয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে। “জেলাভিত্তিক রিপোর্ট কার্ড”-এ আরো দেখা যায়, অধিকাংশ জেলাতেই তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে দূর্বলতা রয়েছে। ৯টি জেলায় টাস্কফোর্স সভা নিয়মিত হয় না , ১২টি জেলায় তামাকজাত পণ্যের মোড়কে তিন মাস অন্তর স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বানী পরিবর্তনের নমুনা পাওয়া যায়নি এবং ১৪টি জেলা থেকে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলে কোনো প্রতিবেদন পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়াও ৬টি জেলায় পাবলিক প্লেসে নো-স্মোকিং সাইনেজ নেই, ১৭টি জেলায় গত তিন মাসে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো জরিমানা করা হয়নি এবং ১৮টি জেলায় অভিযোগ জানানোর কোনো ব্যবস্থাই নেই। ১০টি জেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
সভায় বক্তারা বলেন, জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ টাস্কফোর্স কমিটির সকল সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমন্বয় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু, এমআরপি অনুযায়ী তামাক পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করা এবং আইন লঙ্ঘনকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা। বক্তারা আরও বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি দ্রুত আইনে পরিণত করা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। তারা আরো বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সাথে বেসরকারী সংস্থাসমুহকে আর্থিক অনুদান প্রদানের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
মতবিনিময় সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের প্রতিনিধিবৃন্দ, তামাক নিয়ন্ত্রণে কর্মরত স্থানীয় সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ ও গণমাধ্যমকর্মীগণ।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর