অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১৮ মাস পর আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। তবে বহু আসনে জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করেও শেষ মুহূর্তে পরাজিত হয়েছেন বিভিন্ন দলের অনেক প্রার্থী। এসব প্রার্থীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন—
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ছিল রাজধানীর ঢাকা-৮ আসন। এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস-এর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। নির্বাচনী প্রচারণাকালে নানা ইস্যুতে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। মির্জা আব্বাসের সমালোচনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।
হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ভোর চারটার দিকে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। শেষ পর্যন্ত বহুল আলোচিত এই আসনে প্রায় পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পরাজিত করে মির্জা আব্বাসকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
সারজিস আলম
‘জুলাই যোদ্ধা’দের সমন্বয়ক হিসেবে আলোচনায় ছিলেন সারজিস আলম। পরাজিত হলেও রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি। পঞ্চগড়-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ফলাফল ঘোষণার পর বিজয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানান।
এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ব্যারিস্টার মুহম্মদ নওশাদ জমির ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৮৯ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সম্পাদক সারজিস আলম শাপলাকলি প্রতীকে পান ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট।
তাসনীম জারা
জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ক্লিন ইমেজের অধিকারী এনিসিপির সাবেক নেত্রী ডা. তাসনীম জারা বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনায় ছিলেন। তবে জামায়াত জোটে এনসিপি প্রবেশ করায় তিনি পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। ঢাকা-৯ আসনে হাবীবুর রহমানের বিপক্ষে পরাজয় বরণ করেন তাসনীম জারা। এ আসনে তিনি ফলাফলের দিক থেকে তিন নম্বরে ছিলেন।
মামুনুল হক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ববি হাজ্জাজ এবং ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত মাওলানা মামুনুল হকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। এ আসনে আলোচনায় ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিশের নেতা মামুনুল হক। আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীকে বিনপির প্রার্থী ববি হাজ্জাজ পেয়েছেন ৮৮ হাজার ৩৮৭টি ভোট। অপরদিকে ৮৬ হাজার ৬৭টি ভোট পেয়েছেন মামুনুল হক। তাদের ভোটের ব্যবধান ২ হাজার ৩২০। যদিও ভোর রাতে মাওলানা মামুনুল হক নির্বাচনের ফলাফল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ তুলেছেন।
আমিনুল হক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন আমিনুল হক। তিনি বিগত সময়ে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন সরব। জেল-জুলম নির্যাতনের পাশাপাশি জনপ্রিয়তার কারণে জয়ের ব্যাপারে ছিলেন আশাবাদী। তবে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেনের কাছে তিনি পরাজিত হন।
ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা-১৬ আসনের ১৩৭টি কেন্দ্রে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মো. আব্দুল বাতেন মোট ভোট পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৮২৩টি। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম পেয়েছেন মোট ৮৪ হাজার ২০৭ ভোট।
মিয়া গোলাম পরওয়ার
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। হেবিওয়েট হয়েও খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া–ফুলতলা) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আলি আসগার (লবি) এর নিকট ২ হাজার ৭০২ ভোটে পরাজিত হন। ধানের শীষ প্রতীকে মোহাম্মদ আলি আসগার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৫৮ ভোট। অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মিয়া গোলাম পরওয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৫৬ ভোট। দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ২ হাজার ৭০২।
মোহাম্মদ শিশির মনির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে সবেচেয়ে ক্লিন ইমেজ ও জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেও হেরে গিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জৌষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। নেটিজেনদের ধারণা ছিল জামায়াতের একজন প্রার্থী জয় হলে সেটি হবে শিশির মনির। কিন্তু বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ফলাফলে ৩৯ হাজার ৯৩২ ভোট বেশি পেয়ে বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী জয় লাভ করেছেন। বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ৯৭ হাজার ৭৯০ ভোট। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনির দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৮৫৮ ভোট।
হামিদুর রহমান আজাদ
কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতবদিয়া) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ হেরে গেছেন। তার নিকটতম প্রার্থী আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ ৩৫ হাজার ৬২৮ ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ১২৪ কেন্দ্রের ফলাফলে আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ ফরিদ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ২৬২ ভোট। হামিদুর রহমান আযাদ দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৬৩৪ ভোট।
জিএম কাদের
রংপুর-৩ আসনে জয়ী হয়েছেন মো. মাহবুবুর রহমান (বেলাল), যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মো. সামসুজ্জামান সামু, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রার্থী, যিনি ৮৪ হাজার ৫৭৮ ভোট পান। এছাড়া লাঙ্গল প্রতীকে গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জিএম কাদের) ৪৩ হাজার ৩৮৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন।
মাহমুদুর রহমান মান্না
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে মাহমুদুর রহমান মান্না, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি, হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন। কিন্তু তিনি প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন করতে পারেননি। কেটলি প্রতীকে তার প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৪২৬, ফলে তিনি জামানত হারান। একই আসনে বিজয়ী হন মীর শাহে আলম, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রার্থী, যিনি ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৪ ভোট পান। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাওলানা শাহাদাতুজ্জামান, জামায়াত প্রার্থী, ৯৩ হাজার ৫৪৮ ভোট পান।
হারুনুর রশীদ হারুন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিজয়ী হন নুরুল ইসলাম বুলবুল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬১৩ ভোট পান। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বী হারুনুর রশীদ হারুন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি, ১ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৭ ভোট পেয়ে পরাজিত হন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর