ইসলামে বিবাহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র ইবাদত। এটি শুধু সামাজিক বন্ধন নয়; বরং শরিয়তের দৃষ্টিতে একটি শক্তিশালী চুক্তি (عقد)। অনেক সময় মানুষ হাসি-ঠাট্টা কিংবা মজা করে এমন কিছু কথা বলে ফেলে, যার পরিণতি শরিয়তের দৃষ্টিতে মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে বিবাহ, তালাক এবং তালাকের পর স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণের মতো বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।
তাই প্রশ্ন ওঠে— ঠাট্টা করে কেউ ইজাব-কবুল বললে কি সত্যিই বিয়ে হয়ে যায়? যেমন— একটি ছেলে তার কিছু বন্ধু-বান্ধবের সামনে কোনো মেয়েকে মজা করে বলল— ‘আমি তোমাকে বিয়ে করলাম’। তখন মেয়েটি যদি উত্তরে বলে— ‘আমি কবুল করলাম’। এমন পরিস্থিতিতে কি তাদের মধ্যে শরিয়তসম্মত বিবাহ সংঘটিত হবে?
এই লেখায় কুরআন-হাদিসের আলোকে সে বিষয়ে বিস্তারিত ও প্রামাণ্য আলোচনা তুলে ধরা হলো—
শরিয়তের দৃষ্টিতে মূল বিধান
ইসলামি শরিয়তে কিছু বিষয় আছে, যেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করা হোক কিংবা ঠাট্টা করে— উভয় ক্ষেত্রেই তা কার্যকর হয়ে যায়। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
ثَلَاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ، وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلَاقُ، وَالرَّجْعَةُ
‘তিনটি বিষয় এমন যে, এগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে করলে যেমন কার্যকর হয়, ঠিক তেমনই ঠাট্টা করে করলেও তা কার্যকর হয়ে যায়, তা হলো—
১. বিবাহ
২. তালাক
৩. তালাকের পর স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ (রাজঈ তালাক)।’ (তিরমিজি ১১৮৪)
এই হাদিস থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়—
বিবাহের ইজাব-কবুল যদি ঠাট্টা করেও করা হয়, তবু তা শরিয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ হিসেবেই গণ্য হবে, যদি অন্যান্য শর্তপূরণ হয়।
সাক্ষীর গুরুত্ব
ইসলামে বিবাহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য সাক্ষীর উপস্থিতি অত্যাবশ্যক। হাদিসে পাকে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ
‘অভিভাবক ও দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ শুদ্ধ হয় না।’ (ইবনে হিব্বান ৪০৭৫)
এ হাদিস থেকে যে বিষয়গুলো স্পষ্ট, তা হলো—
> ইজাব-কবুল দুজন বা ততোধিক সাক্ষীর উপস্থিতিতে হলে বিবাহ সংঘটিত হয়
> সাক্ষী নির্দিষ্ট করে দাঁড় করানো জরুরি নয়
> অনেক মানুষের উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল হলে, আলাদা করে সাক্ষী ঘোষণা না করলেও বিবাহ শুদ্ধ হবে
> কিন্তু কোনো সাক্ষী না থাকলে বিবাহ শুদ্ধ হবে না
প্রশ্নে উল্লিখিত ঘটনার শরঈ হুকুম
প্রশ্নে বর্ণিত পরিস্থিতি অনুযায়ী—
> ছেলে ও মেয়ে স্পষ্টভাবে ইজাব ও কবুল বলেছে
> তারা একে অপরের কথা শুনেছে
> দুজন বা তার বেশি লোক (বন্ধু-বান্ধব) উপস্থিত ছিল
এমন অবস্থায় যদিও তা হাসি-ঠাট্টা করে বলা হয়ে থাকে, তবু শরিয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ সংঘটিত হয়ে যাবে।
যদি তারা পরবর্তী সময় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকতে না চায়, তাহলে—
> শরিয়তসম্মত তালাকের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে
> মজা করে বলা হয়েছে—এই অজুহাতে বিবাহ বাতিল হবে না।
ইসলামে বিবাহ, তালাক ও দাম্পত্য সম্পর্ক কোনো খেলাচ্ছলে নেওয়ার বিষয় নয়। কথার গুরুত্ব, নিয়তের ভার এবং শরিয়তের বিধান—সব কিছুই এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তাই হাসি-ঠাট্টা করে হলেও সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হলে বিবাহ সংঘটিত হয়ে যায়। আমাদের উচিত— এসব বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা। অজ্ঞতাবশত হারাম বা জটিলতায় না পড়া এবং ইসলামের বিধানকে সর্বোচ্চ সম্মান করা। আল্লাহতাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং কথা ও কাজে সচেতন থাকার তৌফিক দিন। আমিন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর