কেউ আঁকড়ে ধরেছিলেন বিদ্যুতের তার, কেউ ছুটেছেন পাহাড়ে-বনে; কেউ আবার বন্যার স্রোতের আগে গাড়ি চালিয়ে বেঁচেছেন—প্রাণে ফিরলেও চোখের সামনে ধ্বংসের সেই দৃশ্য ভুলতে পারছেন না তারা।
মাত্র কয়েক মিনিট। এর মধ্যেই বদলে যায় সবকিছু। কোথাও ঘরবাড়ি, কোথাও পুরো বসতি, আবার কোথাও মানুষের জীবন—সবকিছু গ্রাস করে নেয় পাহাড়ি ঢল ও ধ্বংসস্তূপ। কেউ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়েছেন পাহাড়ের দিকে, কেউ ছুটেছেন বনের ভেতর। কেউ আবার বন্যার স্রোতকে পেছনে ফেলে গাড়ি চালিয়ে পালিয়েছেন। আর একজন জীবন বাঁচাতে শেষ আশ্রয় হিসেবে আঁকড়ে ধরেছিলেন বিদ্যুতের তার।
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সাতজনের অভিজ্ঞতা যেন একই বিভীষিকার সাতটি আলাদা গল্প। প্রাণে বেঁচে গেলেও চোখের সামনে স্বজন, পরিচিত মানুষ, ঘরবাড়ি ও পুরো জনপদ হারানোর স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফিরছে তাদের।
গত বুধবার সকালে ভোতেকোশী নদীতে আকস্মিক ভয়াবহ ঢল নামার পর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন তারা। নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে বেঁচে ফেরা এই সাতজনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে।
বিদ্যুতের তার আঁকড়ে আধা ঘণ্টা ঝুলে ছিলেন রামবাচন
৩৬ বছর বয়সী রামবাচন সাহ প্রায় ১৫ বছর ধরে একটি সেতুর কাছে শ্যাম মিষ্টির দোকানে কাজ করতেন। বুধবার সকালে দোকানে মিষ্টি তৈরির সময় হঠাৎ চারদিক থেকে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়ার সময় কোনোভাবে একটি বিদ্যুতের তার তাঁর হাতে আটকে যায়। এরপর প্রায় আধা ঘণ্টা সেই তার আঁকড়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন তিনি।
রামবাচন জানান, নিজেকে বাঁচানোর আর কোনো উপায় ছিল না। তাই বিদ্যুতের তারটিই আঁকড়ে ধরেছিলেন। হাত ফসকে গেলেই স্রোতের পানিতে ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
শেষ পর্যন্ত বেঁচে গেলেও তাঁর সঙ্গে থাকা তিনজনের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারা হলেন সঙ্গীতা, তাঁর ছেলে রাহুল এবং আরেক কর্মী বিনোদ ভগত। বন্যার পর এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন রামবাচন। তবে শরীরের কাদা ধুয়ে গেলেও বুধবার সকালের সেই আতঙ্ক এখনো কাটেনি তাঁর।
বেঁচে ফিরেছেন সচিন, নিখোঁজ মামার পুরো পরিবার
সচিন খাতি বেঁচে ফিরেছেন অনেকটা ভাগ্যের জোরে। বন্যার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। কিন্তু ফিরে এসে জানতে পারেন, তাঁর মামা ও মামির পুরো পরিবার নিখোঁজ। রাসুয়া জেলার স্যাব্রুবেশি-৫ এলাকায় প্রায় ১৫ বছর ধরে গয়নার ব্যবসা করছিলেন তাঁর মামা রাজ কুমার দিয়ালি। স্ত্রী শ্রিতি ও চার বছরের ছেলে শ্রীরাজকে নিয়ে সেখানেই থাকতেন তিনি। সচিনও তাঁদের সঙ্গে থেকে ব্যবসার কাজে সহযোগিতা করতেন।
বুধবার সকালে রাজ কুমার কাজের জন্য সচিনকে চিলিমেতে পাঠান। পরে বন্যার খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ফিরে আসেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন, যে বসতিতে তাঁরা থাকতেন, সেটিই আর নেই। ভয়াবহ স্রোত পুরো এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। বর্তমানে নেপালি সেনাবাহিনীর নিরাপত্তায় ধুনচেতে রয়েছেন সচিন। তাঁর মামা রাজ কুমার, মামি শ্রিতি ও ছোট্ট শ্রীরাজের এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি।
সচিনের পরিবারের সদস্য রাধা খাতি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হলেও অন্তত তাঁদের মরদেহ যেন পাওয়া যায়। পরিবারের সবাই এখনো তাঁদের ফিরে আসার অপেক্ষায়।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কাজ, ব্যবসা বা চাকরির জন্য রাসুয়ায় যাওয়া জেলার অন্তত ১৩ জনের সঙ্গে বন্যার পর থেকে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
বন্যার স্রোতের আগে গাড়ি ছুটিয়ে বাঁচলেন রাজ কুমার
রাজ কুমার কার্কির বেঁচে ফেরার গল্প যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য। মঙ্গলবার তিনি নুয়াকোটের বেত্রাবতিতে পৌঁছেছিলেন। পরদিন সকালে পণ্য নিতে তিমুরের দিকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। হঠাৎ মাইকে সতর্কবার্তা আসে—বন্যা আসছে। সময় নষ্ট না করে কার্কি তাঁর কনটেইনার ট্রাক ঘুরিয়ে গালছির দিকে ছুটতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরই পেছনে তাকিয়ে দেখেন, বিশাল পানির স্রোত তাঁর দিকেই ধেয়ে আসছে। তখন আরও বাড়িয়ে দেন গাড়ির গতি। তাঁর সামনে থাকা কয়েকটি গাড়ি ও চালককে চোখের সামনে স্রোতে ভেসে যেতে দেখেন তিনি। তাঁদের মধ্যে কিরণ ভুজেলের চালানো একটি কনটেইনার ট্রাকও ছিল।
কার্কির ভাষায়, তিনি তখন শুধু গাড়ি চালাচ্ছিলেন আর পেছনে ধেয়ে আসা পানির দিকে তাকাচ্ছিলেন। তাঁর পেছনে থাকা প্রায় নয়টি কনটেইনার ট্রাক এবং সেগুলোর চালক স্রোতে ভেসে যায়।
ত্রিশূলির ধুংগে বাজারে পৌঁছানোর আগমুহূর্তে পাহাড়ের দিকে ট্রাকটি তুলে দেন কার্কি। তাতেই রক্ষা পায় তাঁর জীবন এবং ট্রাক দুটিই। তবে সেদিনের রাতটি তাঁকে অন্য এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখায়। পাহাড়ের ওপর থেকে তিনি দেখেন বেত্রাবতি ও আশপাশের বসতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শহরের বড় একটি অংশ যেন নদীর তলদেশে পরিণত হয়েছে। পরিচিত মানুষদের ত্রিশূলী নদীর স্রোতে ভেসে যেতেও দেখেন তিনি।
৫০০ মিটার উঁচু পাহাড়ে দৌড়ে বাঁচলেন গাথে কামি
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে কাজ করছিলেন সাল্যানের বাসিন্দা গাথে কামি। বুধবার সকালে হঠাৎ পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ার মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তিনি। এরপরই দেখতে পান, ভোতেকোশী নদীর পানি ভয়াবহ গতিতে এগিয়ে আসছে। ৪০ বছর বয়সী কামি তখন আশপাশের সবাইকে দৌড়াতে বলেন। নিজেও ছুটে যান প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু বনাঞ্চলের দিকে। দৌড়ানোর একপর্যায়ে অতিরিক্ত আতঙ্ক ও পরিশ্রমে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফেরার পর নিচের দিকে তাকিয়ে দেখেন—যে বসতি কিছুক্ষণ আগেও মানুষের কোলাহলে ভরা ছিল, সেটি এখন মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। চারদিকে মানুষের চিৎকার।
কামি বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পারেন যে তিনি বেঁচে গেছেন। কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই এখনো সেই দৃশ্য তাঁর সামনে ভেসে ওঠে।
শৈশবে পাহাড়ে গরু-ছাগল চরানোর সময় খাড়া পাহাড়ে দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা সেদিন তাঁকে দ্রুত ওপরে উঠতে সাহায্য করেছিল বলেও জানান তিনি।
পুলিশের পোস্টও নিরাপদ ছিল না, বনে ছুটে বাঁচলেন রাজু
কাস্টমস এজেন্ট রাজু বুধাথোকি বুধবার তিমুরেতে নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হঠাৎ পাহাড় কাঁপতে শুরু করলে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তাঁর মনে হয়েছিল, ভূমিকম্প হচ্ছে। কিন্তু বাইরে বেরিয়েই বুঝতে পারেন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জীবন বাঁচাতে তিনি একটি পুলিশ পোস্টের দিকে দৌড়ান। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখেন, পুলিশ সদস্যরাও নিরাপদ জায়গার সন্ধানে পালাচ্ছেন। পেছনে ফিরে তাকিয়ে রাজু দেখেন, তিমুরের ঘরবাড়ি একের পর এক বন্যার পানিতে ভেঙে পড়ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কিছু বাড়ি ত্রিশূলী নদীতে হারিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তিনি বসতি থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু একটি বনের মধ্যে আশ্রয় নেন। সেখানেই প্রাণে বেঁচে যান।
তিমুরের দিকে তাকিয়ে তখন তাঁর নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না যে তিনি বেঁচে ফিরেছেন। তাঁর কাছে পুরো ঘটনাটি এখনো একটি ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো।
নতুন জীবন পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশের গৌতমের
কাঠমান্ডুর গোকর্ণেশ্বরের বাসিন্দা প্রকাশ গৌতমও বুধবার তিমুরেতে ছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। আকাশ ঢেকে যায় কালো মেঘে। কী ঘটছে, কোথায় নিরাপদ জায়গা—কিছুই বুঝে ওঠার সময় ছিল না। জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে শুরু করেন গৌতম। পালানোর সময় বাঁ পায়ের কনিষ্ঠ আঙুলে আঘাত পান তিনি। পরে কোনোভাবে বনের ভেতরে উঠে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি দেখেন, বন্যার স্রোতে মানুষের মরদেহ ভেসে যাচ্ছে। তিমুরের পুরো বসতি ধ্বংস হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তাঁদের বিদুরে নিয়ে যাওয়া হয়। হেলিকপ্টারে ওঠার পরই গৌতমের মনে হয়—হয়তো সত্যিই এবার বেঁচে ফিরতে পারবেন।
তাঁর ভাষায়, তিনি যেন নতুন জীবন নিয়ে ফিরে এসেছেন।
যে ঢেউ পাহাড়ে ছুড়ে দিয়ে বাঁচিয়ে দিল তুলসী বাহাদুরকে
রাসুয়ার একটি বসতিতে ছিলেন তুলসী বাহাদুর ভান্ডারি। হঠাৎ কালো কাদা ও পানির প্রবল স্রোত পুরো বসতির ওপর দিয়ে বয়ে যেতে শুরু করে। ভয়াবহ স্রোতের মধ্যে তিনি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুদূর যেতেই পানির তোড়ে তাঁকে ধরে ফেলে। এরপর ঘটে অবিশ্বাস্য ঘটনা। একটি শক্তিশালী ঢেউ তাঁকে স্রোতের সঙ্গে ভাসিয়ে না নিয়ে পাশের পাহাড়ের দিকে ছুড়ে দেয়। কোনোভাবে সেখানে গিয়ে আটকে যান তিনি।
তুলসী বাহাদুর বলেন, ওই ঢেউ যদি তাঁকে পাহাড়ের দিকে ছুড়ে না দিত, তাহলে আজ তিনি বেঁচে থাকতেন না। স্রোতের মাঝখান থেকে এক পাশে ছিটকে পড়াই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন বাঁচিয়েছে।
নেপালের ভয়াবহ বন্যা থেকে এই সাতজন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁদের জন্য বিপর্যয় এখনো শেষ হয়নি। কেউ হারিয়েছেন স্বজন, কেউ চোখের সামনে দেখেছেন নিজের পরিচিত জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে। কেউ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরেছেন কয়েক মিনিটের ব্যবধানে, আবার কেউ বেঁচে গিয়েও জানেন না তাঁদের প্রিয়জনেরা কোথায়। তাদের বেঁচে থাকার গল্পগুলো আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় সবাই যেন একই—প্রবল স্রোত, ধসে পড়া ঘরবাড়ি, মানুষের আর্তনাদ আর চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি তাদের তাড়া করে ফিরছে।
বুধবারের সেই কয়েক মিনিট তাদের জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে—বন্যার আগের জীবন আর বন্যার পরের জীবন। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি হয়তো তাদের সঙ্গী হয়ে থাকবে বহুদিন।
সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর