মাসউদুর রহমান: ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাস বিশ্ববাসীকে এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। জানুয়ারির হাড়কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহ থেকে ফেব্রুয়ারির নজিরবিহীন দাবদাহ—প্রকৃতির এই খামখেয়ালি রূপ এখন আর কেবল ‘আবহাওয়া পরিবর্তন’ নয়, বরং এক জলবায়ুগত জরুরি অবস্থা (Climate Emergency) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৬-এর শুরুটা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, প্রকৃতি তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় যে মেরু ঘূর্ণিবায়ু (Polar Vortex) আঘাত হেনেছে, তা গত এক দশকের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। বিশেষ করে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জেট স্ট্রিমের অস্বাভাবিক আচরণের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের হিমশীতল বাতাস সরাসরি জনপদে ঢুকে পড়ছে। এটি বিশ্ব উষ্ণায়নেরই এক বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া।
দক্ষিণ গোলার্ধে যখন গ্রীষ্মকাল চলছে, তখন ল্যাটিন আমেরিকার চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যামাজন অববাহিকায় রেকর্ড পরিমাণ দাবানল পরিলক্ষিত হয়েছে। দীর্ঘায়িত খরার ফলে নদীগুলোর পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বাস্তুসংস্থান ধ্বংসের মুখে। ব্রাজিলের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর আর্দ্রতার অভাব গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি কেবল আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বিশ্বের ‘ফুসফুস’ খ্যাত এই বন ধ্বংস হওয়া মানে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়া।
২০২৬-এর শুরু থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ঢাকা, দিল্লি এবং ব্যাংককে বায়ুদূষণ এক স্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে। জানুয়ারির কুয়াশা আর দূষিত ধোঁয়াশা (Smog) মিলে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তাতে সাধারণ মানুষের ফুসফুস কার্যত বিষবাষ্পে ভরে যাচ্ছে। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) নিয়মিতভাবে ৩০০-৪০০ এর ঘরে অবস্থান করছে। ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এই পরিবেশগত বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে।
বর্তমান সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলো এবং বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। ২০২৬ সালের উচ্চ জোয়ারের (King Tide) ফলে উপকূলীয় কৃষি জমিতে লবণাক্ততা এতটাই বেড়ে গেছে যে, ধান চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ২০২৬ সালের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে কয়েক কোটি মানুষ ‘জলবায়ু শরণার্থী’তে পরিণত হবে।
২০২৬ সালের এই দুই মাসের তথ্য উপাত্ত বলছে, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বজায় রাখা এখন প্রায় অসম্ভব স্বপ্ন। বৈশ্বিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে পরিবেশ রক্ষা যেন এক গৌণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি কোনো দেশের সীমানা মানে না। এখনই যদি জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো না হয় এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা না যায়, তবে ২০২৬ সাল হবে ইতিহাসের সেই মোড়, যেখান থেকে ফেরার আর কোনো পথ থাকবে না।
মাসউদুর রহমান
লেখক ও সাংবাদিক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম- এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
খোলা কলাম এর সর্বশেষ খবর